নারী অভিবাসী গৃহকর্মীর কথা
চোখে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান হাজারো নারী অভিবাসী শ্রমিক
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ২২:৫৯
মালেকা (২৬) সৌদি আরব থেকে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যখন পৌঁছেন, তখন তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অস্থিতিশীল। মালেকাকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি বোধবুদ্ধি হারিয়েছেন। তিনি খুব আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। বিমানবন্দরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দৌড়াচ্ছিলেন। যে কোনো ব্যক্তিকে তিনি আঘাত করতে পারেন! তাঁকে ঢাকার দক্ষিণখানে অবস্থিত বেসরকারি সংস্থা রামরুর অভিবাসী সেবাকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। তাঁর মানসিক অবস্থা দেখে নিয়ে যাওয়া হলো জাতীয় মানসিক ব্যাধি হাসপাতালে। প্রথমে ডাক্তার তাঁকে চিকিৎসা দিতে না চাইলেও পরে চিকিৎসা করেন। ডাক্তাররা জানান, মালেকা হয়তো সৌদি আরবে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁর পরিবারকে মানসিক চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পাপিয়া জাহান (৩৯) ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। এক বাড়িতে কাজের জন্য তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনি প্রথম তিন মাস পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেছিলেন; কিন্তু হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় এবং তাঁর পরিবার পরবর্তী তিন বছর তাঁর কণ্ঠ শুনতে পায়নি। ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাপিয়াকে রামরুর অভিবাসী সেবাকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। পাপিয়া মানসিকভাবে এতটা বিপর্যস্ত ছিলেন যে, তিনি পরিবার, ঠিকানা বা তাঁর পাসপোর্ট সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বারবার তিনি বলছিলেন, 'আমার ছোট ছেলে কাঁদছে, তার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসুন।' রামরু ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক যৌথভাবে তাঁর পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে এবং সৌভাগ্যবশত এক দিনের মধ্যে তারা তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সফল হয়। দীর্ঘ তিন বছর পর পাপিয়ার দেখা পায় বড় ছেলে শাহজাহান (ছদ্মনাম)। জাতীয় মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার পর পাপিয়াকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জানা যায় পাপিয়া সৌদি আরবে নিয়োগকর্তাদের হাতে অসহনীয় নিপীড়নের শিকার হন। তাঁকে শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন করা হয়। একই সঙ্গে তিনি মজুরি চুরির শিকার হন। তাঁকে প্রাপ্য মজুরি না দিয়েই সৌদি আরব থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আকলিমার (২৮) বাড়ি গাজীপুর। গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করতেন। পরে স্থানীয় এজেন্টদের প্ররোচনায় বিদেশে পাড়ি দেন। সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়েছিলেন ২০২১ সালে। প্রায় এক বছর ছিলেন সেখানে। তিনি তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, প্রথম যে নিয়োগকর্তার অধীনে ছিলেন, সেখানে এক মুহূর্ত বসার সুযোগ ছিল না। পানি খাওয়ার জন্যও অনুমতি নিতে হতো। ছয় মাস পর তাঁকে পাঠানো হয় আরেক বাড়িতে কাজের জন্য। সেখানে যাওয়ার সপ্তাহখানেক পর থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হতে থাকেন। এভাবে কয়েক মাস কাটানোর পর সুযোগ পেয়ে পালিয়ে যান আকলিমা। দেশে ফিরেও এখন তিনি সেই অসহনীয় স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, 'বিদেশে যাওয়ার পর তাঁদের তিন ধরনের সংকট হয়। প্রথমত, একটা বড় অংশ অভিযোগ করেন- তিনি ওই দেশের খাবার, পরিবেশ, আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। যার ফলে বেতন ঠিকমতো পান না। দ্বিতীয়ত, ওই নারী শ্রমিক যখন মানিয়ে চলতে পারেন না, ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না, তখন নিয়োগকর্তা তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করেন। তৃতীয়ত, যে চিত্রটা আমরা পাই, সেটা হলো যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এ নিপীড়ন-নির্যাতন এতটাই বীভৎস, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে ওই দেশের সাংস্কৃতিক বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নিয়োগকর্তা মনে করেন, ওই নারী শ্রমিক তাঁর কেনা দাস। তাঁর সঙ্গে যা খুশি তা করা যায়। বাংলাদেশ থেকে একজন নারী গৃহকর্মীর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো দুই হাজার ডলার করে পায়। এ অর্থ দেওয়ার কারণে নিয়োগকর্তার ভাষ্যে এ সম্পর্কটা দাঁড়ায় মনিব আর গোলামের।'
তিনি আরও বলেন, 'ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল কিন্তু এখন সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠানো প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ গৃহকর্মী পাঠানো সীমাবদ্ধ করেছে অথবা না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সৌদি আরব আমাদের ওপর একরকম চাপ দিয়ে যাচ্ছে। নারী গৃহকর্মী না পাঠালে তারা পুরুষ কর্মীদেরও নেবে না। যে নারীরা নিপীড়নের শিকার হন, তাঁরা গ্রামের হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা। আর্থিক ও সামাজিক দুর্বলতার কারণেই নাগরিক হিসেবে তাঁরা প্রকৃত মর্যাদা পান না। যদি এ ঘটনা কোনো মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীর সঙ্গে ঘটত, তাহলে কিন্তু পরিস্থিতি একই রকম থাকত না। এটা সংখ্যার অনুপাতে বিচার করা উচিত না। সেখানে যদি ৫০০ নারীর নিপীড়নের শিকার হয়ে মৃত্যু হয়, ১০০ জন আত্মহত্যা করেন, ১০০ জন ধর্ষণের শিকার হন- এটা পুরো দেশের জন্য লজ্জার। গোটা জাতির জন্য অবমাননাকর। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের নারীর অধিকারের জন্য রাষ্ট্রের সোচ্চার অবস্থান জরুরি।'
যে নারীরা বিদেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসেন, তাঁদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এ ক্ষেত্রে আরও জোরালোভাবে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। শরিফুল হাসান বলেন, 'আমাদের একটি কর্মকৌশল ঠিক করতে হবে- সৌদি আরবে গিয়ে কেউ যদি লাশ হয়ে ফেরত আসেন, তখন কী করতে হবে; কেউ নিপীড়িত হয়ে ফেরত এলে কী করবেন অথবা কেউ সন্তান নিয়ে ফেরত এলেন, সে ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি জায়গায় আমাদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এসব না করেই আমরা নারী শ্রমিকদের সৌদি আরবে পাঠানো শুরু করেছি। এখন আমাদের সার্বিকভাবে একটি কর্মকৌশল নির্ধারণ জরুরি।'
