ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

সন্তানের অভিভাবকত্ব

জাপানি মা, বাংলাদেশি বাবার আইনি লড়াই

জাপানি মা, বাংলাদেশি বাবার আইনি লড়াই
×
×

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

--

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ০৬:৩৩

জাপানে জন্ম নেওয়া দুই শিশুর অভিভাবকত্ব ও হেফাজত নিয়ে জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ইমরান শরীফের বিয়ে হয় ২০০৮ সালে। পারিবারিক কলহে ইমরান শরীফ বড় ও মেজো মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন ২০২১ সালে। তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী আরও একটি কন্যাসন্তান রয়েছে টোকিওতে। অভিভাবকত্বের লড়াই শুরু ওই বছর থেকেই। দুই মেয়েকে পেতে নাকানো এরিকো বাংলাদেশে এসে ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করেন। ওই বছরের ২১ নভেম্বর এক রায়ে ইমরান শরীফের জিম্মায় দুই শিশু থাকবে বলে রায় দেওয়া হয়। তবে তাদের মা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সন্তানদের সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে পারবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন নাকানোর আইনজীবীরা। ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ দুই শিশুকে তাদের মা নাকানো এরিকোর জিম্মায় আপাতত রাখার আদেশ দেন। এ সময়ে বাবা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সন্তানদের সান্নিধ্য পাবেন বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়। পরে এ আদেশের সময়কাল কয়েক দফায় বাড়ানো হয়। গত বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দুই শিশু আপাতত মায়ের কাছে থাকবে আদেশ দিয়ে মামলাটি পারিবারিক আদালতে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। মাতৃত্ব-পিতৃত্বের দাবির লড়াই এখনও থামেনি। গত ২৯ জানুয়ারি পারিবারিক আদালতের রায়ে দুই মেয়েকে মায়ের জিম্মায় দেওয়া হয়।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

এসব মামলার ক্ষেত্রে আমাদের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের একটি দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে শ্যারন-লাইলি মামলায় দেওয়া রায়ে। আমাদের দেশের প্রায় সব প্রথিতযশা আইনজীবী ওই মামলার রায়ের সময়ে ছিলেন। ওই মামলায় লন্ডন থেকে সন্তানকে নিয়ে বাবা এই অজুহাতে চলে এসেছিলেন যে, তাঁর সন্তান মুসলিম সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে না। ওই রায়েও আদালত সন্তানের অভিভাবকত্ব মাকে দিয়েছিলেন।

আমাদের আইনি অঙ্গনে যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত, সেখানে সন্তান তো কোনো সম্পত্তি না। সন্তানের অভিভাবকত্ব দেওয়ার সময়ে আদালত যে বিষয়টি আমলে নেন তা হলো- তার মঙ্গল হবে কোথায়। সন্তানের ভবিষ্যৎ যেখানে সুরক্ষিত হবে, তাঁর কাছেই আদালত অভিভাবকত্ব দেবেন। সেটা মা নাকি বাবা তা বিবেচ্য নয়। তার মানে ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। যেখানে আদালত বুঝতে পারেন সন্তান মায়ের সঙ্গে ভালো থাকবে, সেখানে মায়ের কাছে অভিভাবকত্ব দেবেন; আবার যেখানে মনে হবে মায়ের কাছে থাকার চেয়ে বাবার কাছে সন্তান বেশি সুরক্ষিত ও ভালো থাকবে, সেখানে বাবার কাছেই অভিভাবকত্ব দেওয়া হয়। তবে সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য মা-বাবা দু'জনেরই বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এটি হলো বিশেষ বাস্তবতা। যেখানে আদালত যে কোনো একজনের কাছে অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দেন।

আমাদের সংসার, বিয়ে প্রথা নিয়ে অনেক জটিলতা রয়েছে। আগেও ছিল। সামাজিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ জটিলতা আরও বাড়ছে; সহনশীলতা কমছে। আগে অনেকে মুখ বুজে সহ্য করতেন। এখন করেন না। এতে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। একটা অসুস্থ সম্পর্কের মধ্যে থাকার চেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসাটা মঙ্গলজনক। তবে এ ক্ষেত্রে প্রধান ভুক্তভোগী হলো সন্তান। এ দিকগুলোর সমাধান যে কোথায়, তা এখনই বলে দেওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে ছকবাঁধা কোনো উত্তর দেওয়া যায় না। তবে ওই সন্তানের মানস গঠনের মধ্যেও নানা রকম প্রভাব ফেলছে এসব ভাঙন। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এটি তো এ সময়ের বাস্তবতা। সম্পর্ক টিকছে না, ভেঙে যাচ্ছে। এটি এক জটিল অবস্থা। এমন বাস্তবতায় আদালত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সন্তানের মঙ্গল কোথায়- সেটি আমাদেরও লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

×