ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

অদ্ভুত প্রেমের গল্প ‘উইকার’

অদ্ভুত প্রেমের গল্প ‘উইকার’
×
×

রহমান লেনিন

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১২ | আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

একজন নারী এমন একজন স্বামী চান, যিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করবেন না, তার চেহারা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না; বরং নিঃশর্তভাবে ভালোবাসবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বেত দিয়ে নিজের জন্য একজন স্বামী তৈরি করান। অদ্ভুত, খানিকটা হাস্যকর এ কল্পনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একাকিত্ব, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের সম্পর্কের জটিল মনস্তত্ত্ব। নিজের ইচ্ছেমতো তৈরি সঙ্গীর মধ্যে যেমন রয়েছে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, তেমনি রয়েছে অন্যের স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র সত্তাকে মেনে নেওয়ার প্রশ্ন।

উরসুলা উইলস-জোনসের ছোটগল্প ‘দ্য উইকার হাজব্যান্ড’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘উইকার’ পরিচালনা করেছেন অ্যালেক্স হিউস্টন ফিশার ও এলেনর উইলসন। অভিনয় করেছেন অস্কারজয়ী অভিনয়শিল্পী অলিভিয়া কোলম্যান, আলেকজান্ডার স্কারসগার্ড ও পিটার ডিঙ্কলেজ। আমেরিকায় আগামীকাল সীমিত পরিসরে মুক্তির পর ৩০ অক্টোবর থেকে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী বিস্তৃত হওয়ার কথা।

গল্পটির তাৎপর্য শুধু একজন নারীর অদ্ভুত স্বামী পাওয়ার কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক সমাজ, যেখানে নারীর সৌন্দর্য ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রচলিত ধারণা তার ব্যক্তিগত জীবনকে প্রভাবিত করে। প্রত্যাখ্যাত নারী নিজের জন্য এমন একজন সঙ্গী তৈরি করেন, যিনি প্রচলিত বিচারবোধের ঊর্ধ্বে। কিন্তু এ ব্যক্তিগত সমাধানই যখন সামাজিক পরিসরে আসে, তখন তা গ্রামের পুরুষদের আত্মবিশ্বাস ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। এভাবেই প্রেমের গল্পটি হয়ে ওঠে সামাজিক বিশ্বাস ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ।

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণী ধারণার আলোকে গল্পটি পড়লে একটি প্রশ্ন সামনে আসে। নারীটি কি শুধু একজন সঙ্গী চান, নাকি এমন একটি সম্পর্ক চান, যেখানে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থাকবে না?

ফ্রয়েডের মতে, মানুষের আচরণের পেছনে এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক দ্বন্দ্ব কাজ করে, যেগুলো সব সময় সচেতনভাবে উপলব্ধি করা যায় না। এই দৃষ্টিতে বেতের স্বামীকে নারীটির আকাঙ্ক্ষার এক কল্পিত অবয়ব হিসেবে দেখা যায়। বাস্তব মানুষের নিজস্ব ইচ্ছা ও স্বাধীনতা রয়েছে, এমনকি প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু নিজের চাহিদামতো তৈরি সঙ্গীর ক্ষেত্রে সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই অনুপস্থিত। এটি ফ্রয়েডের সরাসরি ব্যাখ্যা নয়; বরং তার ধারণার আলোকে গল্পটির একটি সম্ভাব্য পাঠ। এখানে ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি রয়েছে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার বাসনা। তবে নিজের পছন্দমতো সঙ্গী তৈরি করার মধ্যে ভালোবাসার স্বাধীনতা কতটা থাকে, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। 

বেত দিয়ে তৈরি স্বামীর আগমন শুধু নারীটির জীবন বদলায় না, গ্রামের অন্যদেরও অস্বস্তিতে ফেলে। তিনি যদি যত্নশীল, আকর্ষণীয় ও সংসারের দায়িত্ব পালনে দক্ষ হন, তাহলে প্রচলিত পুরুষরা কেন তা পারবে না? এখানে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী বেত দিয়ে তৈরি পুরুষ মানুষের প্রতি অন্য নারীদের ঈর্ষা এবং অন্য পুরুষদের অস্বস্তির পেছনে রয়েছে সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা হারানোর ভয়। ফ্রয়েডের আত্মমুগ্ধতা বিষয়ক ধারণা দিয়েও এ প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষ অনেক সময় অন্যের স্বীকৃতি ও তুলনার মাধ্যমে নিজের গুরুত্ব বিচার করে। বেত দিয়ে তৈরি হওয়া নতুন এই স্বামী গ্রামের পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। ফলে তাদের প্রতিক্রিয়া শুধু ঈর্ষা নয়, নিজেদের গুরুত্ব ও পরিচয় নিয়ে অনিরাপত্তারও প্রকাশ হতে পারে। তবে এটি গল্পের একটি সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, চরিত্রগুলোর মানসিক রোগ নির্ণয় নয়।

‘দ্য গার্ডিয়ান’ এই সিনেমার অভিনব কল্পনা ও সামাজিক বিদ্রুপের প্রশংসা করলেও প্রেমের সম্পর্কের আবেগগত বিকাশ আরও গভীর হতে পারত বলে মনে করেছে। অন্যদিকে ‘টাইম আউট’-এর দৃশ্য নির্মাণ ও ব্যতিক্রমী হাস্যরসকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে।

বাণিজ্যিকভাবে ‘উইকার’-এর বড় সম্পদ এর ব্যতিক্রমী কাহিনি ও পরিচিত অভিনয়শিল্পীরা। অলিভিয়া কোলম্যান, আলেকজান্ডার স্কারসগার্ড ও পিটার ডিঙ্কলেজের উপস্থিতি এই সিনেমা দেখার প্রতি দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে। এক বাক্যে বর্ণনা করা যায় এমন অস্বাভাবিক কাহিনি প্রচারচিত্র ও সামাজিক মাধ্যমেও কৌতূহল তৈরির সুযোগ করে দেয়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু, যৌন রসিকতা ও অপ্রচলিত কল্পকাহিনি এর দর্শকগোষ্ঠীকে সীমিত করতে পারে। ‘দ্য র্যাপ’-এর সমালোচকের মতে, আকর্ষণীয় ধারণা থাকা সত্ত্বেও এ চলচ্চিত্রে হাস্যরস ও আবেগ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ‘উইকার’ চলচ্চিত্রের বেত- এর তৈরি স্বামী কেবল কৌতুকের উপকরণ নন। তিনি নিখুঁত ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব সম্পর্কের অনিশ্চয়তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। এ দ্বন্দ্বকে এই চলচ্চিত্র কতটা গভীরভাবে তুলে ধরতে পেরেছে, তার ওপরই নির্ভর করবে এটা নিছক অদ্ভুত প্রেমের হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্র হয়ে থাকবে নাকি দর্শককে নিজের সম্পর্ক ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবাবে।

আরও পড়ুন

×