ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নাটক সিনেমায় আবহমান বাংলা

নাটক সিনেমায় আবহমান বাংলা
×

‘মনপুরা’ সিনেমায় ফারহানা মিলি ও চঞ্চল চৌধুরী

এমদাদুল হক মিলটন

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৩ | ০৫:৪৯

বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উৎসব কোনটি? দীর্ঘকাল ধরে নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কোন উৎসবটি ঘটা করে উদযাপন হয়ে আসছে? বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক উৎসব হচ্ছে পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। আলপনা আঁকা, শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এদিনটি উদযাপন করা যায় না। সঙ্গে লাল-সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে-গালে ফুলকি আঁকা এখন অনেকটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষবরণের সংস্কৃতি এখন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারের কল্যাণে উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

বৈশাখ মনে করিয়ে দেয় কালবৈশাখীর তাণ্ডবের কথা। প্রলয়ংকরী ঝড়ে লন্ডভন্ড হয় বসতভিটা, ফসল। এরপরও পুরো জাতি নববর্ষ উদযাপন করে আনন্দে। বর্ষবরণের মূল আয়োজন মূলত ঢাকার রমনা পার্কের বটমূলকে ঘিরেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’ গানের মাধ্যমে তারা স্বাগত জানাতে শুরু করে নতুন বছরকে। পুরোনো বছরের জীর্ণতা আর ক্লেদ পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নবজীবনের সংগীত নিয়ে হাজির হচ্ছে আরও একটি সোনালি সকাল।

বাংলাদেশের আবহমান কালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় গ্রামবাংলার লোকসংগীতে, জারি ও সারি গানে, যাত্রাপালায়, পুঁথি পাঠ, গ্রামীণ মেলা, ঈদ, পূজাসহ সকল ধর্মের নানা মুখরিত উৎসবের মধ্য দিয়ে। টেলিভিশন নাটকে, আধুনিক ডিজিটাল সকল প্ল্যাটফর্মে, চলচ্চিত্রে এবং সর্বোপরি মঞ্চনাটকে আমাদের সাংস্কৃতিক প্রবাহ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় বলে মনে করছেন মঞ্চসারথি আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘‘সেলিম আল দীনের ‘কিত্তনখোলা’, ‘হাত হদাই’, ‘কেরামত মঙ্গল’সহ তাঁর আরও কয়েকটি নাটকে গ্রাম বাংলার মানুষদের দ্রোহ চেতনার চিত্রসহ সার্বিক অবয়ব অনন্য দক্ষতায় লিপিবদ্ধ ও অভিনীত হয়েছে। এ ছাড়া পরবর্তী নাট্যকাররা, বয়সে এখনও যারা নবীন, তারাও গ্রামবাংলাকে পরিহার করেনি। কারণ, গ্রামীণ জীবনই আমাদের মনন এবং উৎসবের সূতিকাগার।

আমাদের চলচ্চিত্রেও লোকজকাহিনি নানাভাবে এসেছে। চলচ্চিত্র ‘হাছন রাজা’, ‘লালন ফকির’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’, ‘মাটির ময়না’, ‘রূপবান’, ‘রাখাল বন্ধু’, ‘সাতভাই চম্পা জাগো রে’ উল্লেখযোগ্য। বাঙালির সার্বিক জীবন পরিক্রমায় লোকজ সংস্কৃতি উঠে এসেছে নানাভাবে নানা প্রকরণে। বাঙালির জীবনের আধুনিকতা এবং লোকজ সংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গিভাবে আবিষ্ট। বাংলার সার্বিক জীবনধারায় গ্রামীণ ও লোকজীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।” আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস সুদীর্ঘ। বরেণ্য নির্মাতারা নির্মাণ করেছেন গ্রামীণ পটভূমির অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা ছিল গ্রামীণ গল্পের সিনেমা। এই ধরনের সিনেমায় নিখুঁতভাবে সমাজ ও পরিবেশ, মাটি ও মানুষের কথা চিত্রাকারে উঠে এসেছে।

একটা সময় আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করতেন। সিনেমাগুলোতে উপস্থাপিত লোকজ সংস্কৃতি তাদের স্পর্শ করত বেশি। দর্শক মুখিয়ে থাকতেন সিনেমা দেখার জন্য। দলবেঁধে পরিবার-পরিজন নিয়ে যেতেন সিনেমা হলে। শুধু সিনেমা নিয়েই আলোচনা হতো পাড়া-মহল্লায়। আবহমান গ্রামবাংলা পটভূমি নিয়ে নির্মিত ‘ময়নামতি’, ‘সুজনসখী’, ‘লাঠিয়াল’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘বিনি সুতোর মালা’, ‘নোলক’, ‘খাইরুন সুন্দরী’সহ অনেক সিনেমা দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। চলচ্চিত্রে বাঁক বদলেছে গ্রামীণ পটভূমির সিনেমা এখন অনেকটাই উপেক্ষিত। এমনটিই মনে করছেন চলচ্চিত্রবোদ্ধারা।

বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন একটি উৎসব। শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালি বাংলা নববর্ষের আমেজে মেতে ওঠে। আমার কাছে পহেলা বৈশাখের মর্মার্থ হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনা। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এই চেতনা বিদ্যমান। বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনে অসাম্প্রদায়িক বৈশাখের চেতনা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে আমাদের টিভি ও মঞ্চনাটকে বৈশাখের চেতনা নেই বললেই চলে। পহেলা বৈশাখ নিয়ে এখন বিভিন্ন চ্যানেলে নাটক প্রচার হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয়, পহেলা বৈশাখের অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে এসব নাটক পুরোপুরি বিচ্যুত। দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্যই মূলত এসব নাটক নির্মাণ করা হয়ে থাকে। ফলে বৈশাখের নাটকে বৈশাখের চেতনা খুঁজে পাওয়া যায় না। এ তো গেল টিভি নাটকে পহেলা বৈশাখের কথা। মঞ্চনাটকে বৈশাখ নিয়ে সরাসরি কোনো কাজ হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলেও মঞ্চে এ নিয়ে কোনো কাজ না হওয়ার বিষয়টি আমাকে পীড়া দেয়। এটা দুঃখজনকও।

সাতচল্লিশের দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে বেশিরভাগ নাট্যকারই ঔপনিবেশিক নাট্যরীতিকে তাঁদের রচনায় প্রয়োগ ঘটান। ফলে নাটকের দৃশ্যান্তরে পাশ্চাত্যের প্রভাব ছিল প্রবল। সে প্রভাব কাটিয়ে বাংলা নাটককে ঘরে ফেরানোর অবদান সবচেয়ে বেশি নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের। এমনটিই মনে করছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘বাংলা নাটক নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতেও নাট্যচর্চার উপস্থিতি খুঁজে পান সেলিম আল দীন। ইউরোপীয় ধারাকে তিনি একপাশে সরিয়ে নিজস্ব ধারার দিকে ধাবিত করেন বাংলা নাটককে। যে জন্য তাঁকে কেউ বলেন ‘বাংলা নাটকের মহাকবি’, আবার কেউ বলেন ‘বাংলা নাটকের বাঁকবদলের কারিগর’।

সেলিম আল দীনের দেশজ ধারার নাটকগুলো পাঠ করলে কিংবা মঞ্চায়ন দেখলে খুব সহজেই বোঝা যায়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় ও বহুমাত্রিক জীবনধারাই শৈল্পিকভাবে উঠে এসেছে তাঁর কাজে। বাংলার হাজার বছরের পুরোনো লোকজ উপাদানকে ব্যবহার করে জলজ এই ব-দ্বীপের পোড়-খাওয়া, চিরসংগ্রামী, সরল, স্বাধীনচেতা, আত্মনির্ভর, নির্ভীক, সাহসী মানুষদের জীবনকাব্যের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সেলিম আল দীন তাঁর নাটকের প্রতিটি দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। নাটকে অসংখ্য চরিত্রের দৃশ্যলোক তৈরি করেছেন তিনি। নাটকের গল্পগুলোতে এই বিচিত্র চরিত্রগুলোর বেশিরভাগেরই বিকাশ ঘটেছে ‘সামাজিক রূপান্তর’-এর ধারাবাহিকতায়; অর্থাৎ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে স্বীকার করে উত্থান-পতনের ধারায় গ্রামীণ মানুষের মধ্যে নিরন্তর যে পেশাবদলের প্রক্রিয়া চলে, সেটি নাট্যচর্চার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুলে এনেছেন তিনি।’

বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলেও টিভি ও মঞ্চে এ নিয়ে খুব বেশি কাজ না হওয়ার হতাশা প্রকাশ করে নাট্যকার মাসুম রেজা বলেন, “নববর্ষ আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় চেতনা। পহেলা বৈশাখের আয়োজনের মাধ্যমে সবাইকেই বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ, বাঙালি একটি অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা। তাই তো আমার লেখায় থাকে গ্রামবাংলা। ‘রঙের মানুষ’, ‘ভবের হাট’ নাটকে আমি পরিপূর্ণভাবে গ্রামের জীবন ও আবহমান বাংলা দেখিয়েছি। মঞ্চেও আমাদের কৃষ্টি, সাহিত্য তুলে ধরছি। ‘মোল্লাবাড়ীর বউ’, ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ সিনেমায় চেষ্টা করেছি গ্রামবাংলাকে তুলে ধরতে।

গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় উঠে এসেছে আবহমান বাংলা। আমাদের গ্রামীণ জীবনধারা। আবহমান বাংলাকে ভুলে গেলে চলবে না। আমরা কপি-পেস্টের যুগে বাস করছি । কপি-পেস্ট করে জীবন চলে না। অন্যের জীবনযাপন বা ধারণা কপি করে নিয়ে এসে আমাদের এখানে পেস্ট করলে সেটি আসলে একটি কৃত্রিম জায়গা তৈরি হবে। নিজের জীবন নিজের মতো করে যাপন করতে হবে। নিজের যা আছে তা-ই দিয়ে যাপনই কিন্তু সভ্যতা। সংস্কৃতিও তাই, যা আমরা ধারণ করি।”

আরও পড়ুন

×