জেন্ডার বাজেটে সীমাবদ্ধতা
নারী খাতে বরাদ্দ চ্যারিটি নয়
রাশেদা কে চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
জেন্ডার বাজেট নারীর জন্য আলাদা কোনো বাজেট নয়; বরং এটি একটি বিশেষ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় হিসাবনিকাশের সাহায্যে জাতীয় বাজেটের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ করা যায়। নারীর ক্ষমতায়ন ও বাজেটে জেন্ডার বৈষম্য দূর করতে কেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে– এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। গ্রন্থনা শাহেরীন আরাফাত
বাজেটে ভীষণ রকম অস্পষ্টতা আছে। অনেক কিছু যেমন স্পষ্ট হয়নি; প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনাকালে মেয়েদের বাল্যবিয়ে এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো যে সমস্যাগুলো হয়েছিল, তার কোনো কিছু উল্লেখ নেই। এ থেকে উত্তরণের কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
খাত হিসেবে বিবেচনায় নিলে শিক্ষায় যে বরাদ্দ এসেছে, তা এসেছে মূলত সামাজিক নিরাপত্তার জায়গা থেকে। যেমন– বৃত্তি, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাল্যবিয়ে, ঝরে পড়ার মতো যে সমস্যাগুলো আছে আমাদের সামনে, সেগুলো নিরোধ করতে সুনির্দিষ্ট তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখিনি।
স্বাস্থ্য খাতের কথা ধরা যাক– শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যুর ক্ষেত্রে আমরা অনেক অর্জন করেছি। এটি শুধু প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার যে অধিকার, সেদিকে তেমন অর্জন দেখা যায়নি।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে নারী বা মেয়েদের বিষয়ে কিছুটা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সেটি বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে ভীষণ অপ্রতুল। অভিভাবক মন্ত্রণালয় হলো মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বাজেটে তাদের বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। এ ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের অভাব লক্ষণীয়। গবেষণায় যে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগের দরকার ছিল সেটি হয়নি। বাংলাদেশ কৃষি খাতে গবেষণায় বিনিয়োগ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী উন্নয়নের মতো খাতে গবেষণায় তেমন বরাদ্দ দেখা যায় না। আমাদের কাছে যখন ইউএনএফপিএ ছাড়া কোনো তথ্য নেই বাল্যবিয়ে বা ঝরে পড়া মেয়েদের বিষয়ে, তখন এ সম্পর্কে আমরা পরিকল্পনা করব কীভাবে? পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে আমরা কিছু তথ্য-উপাত্ত পাই। তার বেশিরভাগেই জেন্ডার নির্দিষ্ট থাকে না। মেয়েদের বিষয়ে বা নারী শ্রমিকদের নিয়ে পৃথক গবেষণা দেখা যায় না। অথচ ওই নারী শ্রমিকদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় ভর করে আমাদের অর্থনীতি এগিয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের বিষয়েও এমন কোনো কিছু দেখা যায়নি আগের বাজেটের তুলনায়। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধেও নতুন কোনো কিছু নেই। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিটা কাজ করে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যদি রক্ষণশীলতাকে অজুহাত হিসেবে বলা হয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়।

যাঁরা নীতিনির্ধারণ করবেন, তাঁদের মধ্যেই এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। তাঁরা এখনও সমান সুযোগ পাওয়ার পদক্ষেপকে চ্যারিটি হিসেবে মনে করেন, নারীর অধিকার হিসেবে বিবেচনা করেন না। এটি দয়া নয়।
সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের নারীরা বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে শুরু করে সব কাজেই নারীরা আছেন। সেটি ক্ষমতায়ন নয়। অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব এক নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী কোথায়? পার্লামেন্টে এখনও নারীকে ৩৩ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এখনও তো মনোনীত তাঁরা, নির্বাচিত নন। এভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি– সমাজের সবখানেই অংশগ্রহণে নারী আছে। অংশগ্রহণ করে নারী দেখাচ্ছে যে, সে পারে; কিন্তু অংশীদারিত্বে তারা নেই।
- বিষয় :
- জেন্ডার বাজেট
- নারী খাত
- চ্যারিটি
