পাট খাতে সংকট কাটছে না
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাটপণ্যেও আসছে বৈচিত্র্য। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কিন্তু সংকট যেন কাটছেই না। রপ্তানি ক্রমশ কমছে। সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ। পাঁচ বছরে বন্ধ হয়েছে ৭০টি বেসরকারি পাটকল। এ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন আবু হেনা মুহিব।
এখনও বিশ্বের সবচেয়ে মানসম্পন্ন পাট উৎপন্ন হয় বাংলাদেশেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে পাটের আবাদ এবং উৎপাদনও বেড়েছে। পাটপণ্যেও আসছে বৈচিত্র্য। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের বিশ্ব বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে পাটের নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফের বাড়ছে পাটপণ্যের ব্যবহার। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সোনালি আঁশখ্যাত পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব– এমনটাই বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। বাস্তবতা হচ্ছে, পাট খাতের সংকট যেন কাটছেই না। পাটের রপ্তানি কমে গেছে অনেক। সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ। বেসরকারি খাতের অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে অথবা বন্ধ হওয়ার পথে।
সরকারের নানা উদ্যোগ
দেশের পাট খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাটজাত পণ্যকে ২০২৩ সালের ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ বা বর্ষপণ্য এবং পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করেছে সরকার। ফলে পাট উৎপাদন, বিপণন ও রপ্তানিতে অন্য কৃষিপণ্যের মতো ঋণ, রপ্তানি প্রণোদনাসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।
পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদন, বাজারজাত, রপ্তানি উৎসাহিত করতে ইতোমধ্যে আইন, পাটনীতি, বস্ত্রশিল্প আইন ও বস্ত্রনীতি করা হয়েছে। পাটচাষিদের সহায়তায় গঠন করা হয়েছে তহবিল। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে পাটের বীজ উৎপাদনে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় সার, চিনি, ধান, চালসহ ১৭টি পণ্য বিক্রি, বিতরণ ও সরবরাহে বাধ্যতামূলক পাটজাত মোড়ক ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার-সংক্রান্ত আইন আছে। পাটকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে (জেডিপিসি) প্রায় ২৫০ প্রকার বহুমুখী পাটপণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু হয়েছে। রপ্তানিমুখী পাটপণ্য বহুমুখীকরণে নগদ সহায়তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে।
উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ বাজার
গত এক দশকে পাট চাষের আওতায় থাকা জমির পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে ১০ লাখ ৭৯ হাজার একর জমিতে পাট চাষ হয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে চাষ হয় ১৬ লাখ ৮৩ হাজার একরে। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে পাট চাষের আওতায় থাকা জমির পরিমাণ আরও বেড়ে হয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার একর। বর্তমানে প্রতি বছর দেশে গড়ে ৮৫ থেকে ৯০ লাখ বেল কাঁচাপাট উৎপাদন হয়। বেসরকারি পাটকলগুলোতে ব্যবহার হয় ৬০ লাখ বেলের মতো। গৃহস্থালিতে ব্যবহারে যায় ৫ লাখ বেল কাঁচাপাট। বাকি কাঁচাপাট রপ্তানি হয়ে থাকে। অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের বাজার রয়েছে প্রায় ৭১৭ কোটি টাকার।
কৃষি তথ্য সার্ভিস থেকে জানা যায়, প্রায় ৪০ লাখ চাষি পাট চাষ করেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪ কোটি মানুষের জীবিকা পাটকে কেন্দ্র করে। দেশের প্রায় সব জেলাতেই পাট উৎপন্ন হয়। তবে বেশি উৎপাদন হয় ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলায়।
রপ্তানি কমছেই
পাটের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও পাটের রপ্তানি কমছেই। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি তো বাড়েইনি বরং আগের অর্থবছরের চেয়ে কমে গেছে ৩ শতাংশ। এ ধারা এখনও অব্যাহত আছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে সব ধরনের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি কমেছে ২০ শতাংশের মতো। এ সময় রপ্তানি হয়েছে মোট ৮৫ কোটি ডলারেরও কম, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ১০৬ কোটি ডলার।
রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধানে এবার পিছিয়ে থাকবে পাট খাত। চলতি অর্থবছর পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ১২৮ কোটি ডলার। অর্থবছর শেষ হতে মাত্র কয়েকদিন বাকি। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে চলতি জুন মাসে ৪৩ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের প্রয়োজন। বাস্তবতা অনুযায়ী যা অসম্ভব।
রপ্তানি কমে আসায় মোট রপ্তানি আয়ে পাটের হিস্যাও কমছে। এখন এ হার মাত্র ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অথচ একসময় মোট রপ্তানি আয়ে পাটের অবদান ছিল ৯৭ শতাংশ।
পাঁচ বছরে বন্ধ ৭০ বেসরকারি পাটকল
যতই দিন যাচ্ছে, পাট খাতের সমস্যা যেন ততই প্রকট হচ্ছে। এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচাপাটের দাম বেশি। আবার বেশি দাম দিয়েও সব সময় পাট পাওয়া যায় না। উৎপাদন ব্যয় বাড়ছেই। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টেকা মুশকিল হয়ে পড়ছে উদ্যোক্তাদের। যে কারণে পাটপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি দুটিই কমছে। বিদেশি ব্র্যান্ড এবং ক্রেতারা বিকল্প খুঁজছেন। ফলে নতুন রপ্তানি আদেশও প্রায় বন্ধ। এসব কারণে ৭০টি পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে। চালু থাকা পাটকলগুলোতেও সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন হচ্ছে। বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) মোট কারখানা ছিল ২০২টি। এখন ১৩২টি উৎপাদনে আছে। চালু থাকা অনেক পাটকলের দুই-তৃতীয়াংশ লুমস বা তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে বিজেএমএর চেয়ারম্যান আবুল হোসাইন সমকালকে বলেন, সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে শুরু করে। কারণ, সরকারি পাটকলে সরবরাহের স্বার্থে পাটের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগে সরকারের প্রচেষ্টা ছিল। এখন সেই প্রয়োজন নেই। এ কারণে বাজারে অস্থিরতা চলছে।
বিজেএমএর মহাসচিব আব্দুল বারেক খান সমকালকে বলেন, যত দিন যাচ্ছে, পরিস্থিতি যেন ততই খারাপের দিকে মোড় নিচ্ছে। অনেকে পাটকল বন্ধ করে দিয়েছেন। পরিস্থিতি পাল্টাবে সে আশায় লোকসান গুনে উৎপাদন চালিয়ে নিচ্ছেন কেউ কেউ।
পাটের পণ্য
সাম্প্রতিক সময়ে পাটপণ্যে এসেছে বৈচিত্র্য। পাটের সনাতন পণ্য চট, বস্তা, দড়ি, সিবিসি ইত্যাদির পাশাপাশি আধুনিক পণ্য ফ্রেবিক্স, পাট উল, কম্বল, জায়নামাজ, কার্পেট, কাগজ, স্যানিটারি ন্যাপকিন, অগ্নিরোধী পাট আঁশ বা কাপড়, পচনরোধী নার্সারি পট ইত্যাদি উৎপাদন হচ্ছে। পাট ও পাটজাত বর্জ্যের সেলুলোজ থেকে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, পাটের তৈরি জিন্স, পাট ও তুলার মিশ্রণে তৈরি বিশেষ সুতা (ভিসকস), পাট কাটিংস ও নিম্নমানের পাটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে নারকেলের ছোবড়ার সংমিশ্রণে প্রস্তুত জুট জিওটেক্সটাইল, পাটখড়ি থেকে উৎপাদিত ছাপাখানার বিশেষ কালি– চারকোলও তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া পাঞ্জাবি, ফতুয়া, নকশিকাঁথাসহ দুই শতাধিক বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন হয়। অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানি হয়ও এসব পণ্য।
- বিষয় :
- পাট খাত
- পাট খাতে সংকট
