ফোর্বসের তালিকায় নবনীতা
জসিম উদ্দিন আকাশ
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০
নবনীতা নাওয়ার। কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও উদ্যোক্তা। গত ৯ আগস্ট বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘ফোর্বস’-এর কানাডার টরন্টোর অনূর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সী ৩০ তরুণ নেতার তালিকায় উঠে আসে তাঁর নাম। ২৮ বছর বয়সী এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকসের সহপ্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের নবনীতা নাওয়ারের গল্প শুনি...
ফোর্বস প্রথমবারের মতো ‘৩০ আন্ডার ৩০ লোকাল টরন্টো’ তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় উঠে আসা তরুণদের কেউ শহরে নিরাপদ ড্রোন চলাচলে সহায়তা করেন, কেউ উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে বিকল্প প্লাস্টিক বানান, কেউবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেখা শনাক্তকারী নির্মাণসামগ্রী তৈরি করেন। ফোর্বসের মতে, বর্তমানে কানাডায় ব্যবসা ও প্রযুক্তিজীবনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে টরন্টো। এখানে তরুণরা নানা উদ্ভাবনী ধারণা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যৎ দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেবে। সে কারণেই টরন্টোর জন্য আলাদা তালিকা করেছে ফোর্বস। তালিকায় তরুণ গবেষক ও উদ্যোক্তা হিসেবে স্থান পান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নবনীতা নাওয়ার ও থাই বংশোদ্ভূত পিমুয়াপা মানসিয়ংকুল। তারা দু’জন এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকস নামে টরন্টোভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকস
ফোর্বসের মতে, নবনীতা ও পিমুয়াপার এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকস প্রথমবারের মতো পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা বা ওষুধের উন্নয়নে কাজ করছে, যা বিশ্বের তিন কোটির বেশি মানুষের কাজে লাগবে। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য নেওয়া কেমোথেরাপি, ডায়াবেটিস, কোনো আঘাত বা জিনগত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুর ফলে ব্যথা, বোধহীনতা, পক্ষাঘাত ও চলনহীনতায় ভোগেন পিএন রোগীরা। এ রোগের এখনও কোনো ওষুধ নেই, যা এর বেড়ে ওঠা ঠেকাতে পারে। এইচডিএএক্স ২০২৫ সালের প্রথম দিকে রোগীদের আশা জাগানোর মতো ওষুধ তৈরি করতে যাচ্ছে। নারী নেতৃত্বে চলা দলটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা পিএন রোগীদের জীবন রঙিন করে তুলতে পারে। ক্যান্সার গবেষণার সেরা ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে পাঁচ বছরের গবেষণার পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এইচডিএএক্স। এটি পরিচালনা করছেন পিএচডি ডিগ্রিধারী উদ্যোক্তারা। নতুন ওষুধ আবিষ্কারের জন্য এইচডিএএক্স এ পর্যন্ত ৮ লাখ মার্কিন ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে। নবনীতা নাওয়ার ও পিমুয়াপা মানসিয়ংকুল ছাড়া আরও দু’জন সহ-প্রতিষ্ঠাতা রয়েছেন এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকসে। তারা হলেন– নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. রোমান ফ্লেক এবং টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্যাট্রিক গানিং।
এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকসের কার্যক্রম
যেসব রোগের ওষুধ এখনও তৈরি হয়নি, সেসব ওষুধ আবিষ্কার করাই এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকসের উদ্দেশ্য। যদিও ওষুধ আবিষ্কার এবং তা ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে আনা বেশ সময়ের ব্যাপার। এসব বিষয় মাথায় রেখেই কাজ করছে এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকস। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শুধু পিএন রোগের নিদান নিয়ে গবেষণা করছে। এ প্রক্রিয়া ১০ বছরের। দুটি পেটেন্ট স্বত্বের জন্য আবেদনও করেছে এইচডিএএক্স। এরই মধ্যে ওষুধটি ইঁদুরের ওপর প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে। হয়তো আগামী দুই বছরের মাথায় এটি রোগীর ওপর পরীক্ষা করা যাবে।
বেড়ে ওঠা ও যেভাবে কানাডার পথে...
নবনীতার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। ১৯৯৪ সালে জন্ম নেওয়া নবনীতার বাবা মাহবুবুর রহমান তৈরি পোশাক কারখানার মালিক। মা গুলশান পারভীন গৃহিণী। এক ভাই এক বোনের মধ্যে বড় নবনীতা ঢাকার আগা খান স্কুল থেকে এ-লেভেল দিয়ে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিক বৃত্তি নিয়ে বায়োমেডিকেল কেমিস্ট্রিতে স্নাতক করতে ২০১৩ সালে কানাডায় পাড়ি জমান। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিসিনাল কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন নবনীতা। সেই সঙ্গে চলতে থাকে গবেষণার কাজও। ২০২১ সালে পিমুয়াপা মানসিয়ংকুলের সঙ্গে গড়ে তোলেন এইচডিএএক্স থেরাপিউটিকস। পাশাপাশি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝে মধ্যে ক্লাসও করান তিনি।
নবনীতার উচ্ছ্বাস ও অপেক্ষার প্রহর
ফোর্বসের ‘৩০ আন্ডার ৩০ লোকাল টরন্টো’ তালিকায় নিজের নাম দেখে কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও উদ্যোক্তা নবনীতা নাওয়ার টুইটারে লেখেন, ‘এই অসামান্য স্বীকৃতির জন্য ফোর্বসকে ধন্যবাদ। পাশাপাশি যারা আমাদের যাত্রার অংশ হয়েছেন তাদের সবাইকেও। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করা এবং বেড়ে ওঠা এক নারীর টরন্টো এবং বিশ্বের বুকে এমন স্বীকৃতি পরাবাস্তবতার মতোই।’
এ তালিকার জন্য ফোর্বস তরুণদের বিভিন্ন উদ্যোগের মনোনয়ন চেয়েছে। অসংখ্য মনোনয়ন থেকে সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে যাচাইবাছাই করা হয়েছে। এরপর কাজের বিস্তারিত জেনে ফোর্বস তালিকা চূড়ান্ত করে। সেই তালিকায় স্থান করে নেওয়া বাংলাদেশি গবেষক ও উদ্যোক্তা নবনীতা নাওয়ারকে ঘিরে আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি। তাদের তৈরি পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা বা ওষুধের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতেই পারি!
- বিষয় :
- নবনীতা নাওয়ার
- ফোর্বস
