ইনসুলিন নিচ্ছেন, জানতে হবে কিছু নিয়ম
.
লে. কর্ণেল ডা: নাসির উদ্দিন
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১৩:২৬
ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ইনসুলিন যেন প্রাণভোমরা। ইনসুলিন আবিষ্কারের পূর্বে টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীরা নীরবে মৃত্যুর প্রহর গুনতেন। ডায়াবেটিস নির্ণিত হলে তাদের জীবনে মৃত্যু ঘণ্টা বেজে উঠত।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের পাশাপাশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস চিকিৎসার এক পর্যায়ে ইনসুলিন ছাড়া উপায়ান্তর থাকে না। যারা চিকিৎসার জন্য ইনসুলিন ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য অনেকগুলো বিষয় জেনে রাখা খুবই জরুরি।
কোথায় রাখবেন
এটি অত্যধিক উষ্ণ কিংবা নিম্ন তাপমাত্রায় নষ্ট হয়ে যায়। সরাসরি রোদের সংস্পর্শে কিংবা ডিপ ফ্রিজে রাখলে এটি কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। এটি সংরক্ষণ করতে হবে সাধারণ ফ্রিজে, ডিপ ফ্রিজে নয়। ইনসুলিন সংরক্ষণের জন্য উপযোগী তাপমাত্রা হলো দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদি ঘরে ফ্রিজ না থাকে তবে ইনসুলিন ভায়ালের বদলে কলম ব্যবহার করা যেতে পারে। কেননা, ইনসুলিনের কলম ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখলে কোনো ক্ষতি হয় না। যাদের ঘরে ফ্রিজ নেই, তারা ঘরের অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে বিশেষত খাট বা চৌকির নিচে ইনসুলিন প্যাকেটে করে রাখতে পারেন। এ ছাড়া পানিপূর্ণ মাটির কলসির ভেতরে পলিথিনের প্যাকেটে আটকে ইনসুলিন রাখা যেতে পারে। প্রতিবেশীর ফ্রিজের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে।
ইনসুলিন কোথায় প্রয়োগ করবেন
ইনসুলিন প্রয়োগের উৎকৃষ্ট স্থান পেটের চামড়ার নিচে। একজন মানুষের চামড়া দুই থেকে চার মিলিমিটার পুরু। এর নিচেই রয়েছে চর্বির স্তর। নাভির ওপরে ও নিচে ২ ইঞ্চি দূরে ভূমির সমান্তরালের জায়গাটুকু ইনসুলিন প্রয়োগের আদর্শ স্থান। এ ছাড়া ঊর্ধ্ব-বাহু এবং ঊরুর বাইরের দিকের মাঝের এক-তৃতীয়াংশে এটি প্রয়োগ করা যায়। ছোট বাচ্চাদের নিতম্ব দেশে ইনসুলিন দেওয়া যেতে পারে।
ইনসুলিনের মেয়াদ ও চেহারা
ইনজেকশন নেওয়ার আগে মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ পরীক্ষা করা দরকার। ভালো করে দেখে নিন ইনসুলিনের চেহারা ঠিক আছে কিনা। ঘোলাটে হয়ে গেলে, রং বদলে গেলে কিংবা অধক্ষেপ পড়ে থাকলে এটি ব্যবহার করা যাবে না। নতুন কোনো ভায়াল কিংবা কলম ব্যবহারের জন্য খুললে তারিখ লিখে রাখতে হবে। কেননা, এটি আপনাকে সাহায্য করবে কখন তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে তা বলার জন্য। চার সপ্তাহ পর খোলা ভায়াল আর ব্যবহার করবেন না। ভায়াল খুলে ফেলার পর ইনসুলিনের গাঠনিক কাঠামো বদলে যেতে পারে। এতে এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে।
ইনসুলিন দেওয়ার আগে লক্ষণীয়
ইনসুলিনের প্রয়োগের স্থানটি ভালোভাবে পরখ করা দরকার। বারবার ইনসুলিন প্রয়োগের ফলে ত্বকের পুরুত্ব বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে, লিপো-হাইপারট্রফি। কখনও চামড়ার পুরুত্ব কমেও যেতে পারে। চামড়ার পুরুত্বের এই তারতম্য আছে কিনা ইনসুলিন প্রয়োগের আগে তা পরখ করে নিতে হবে। প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার ইনসুলিন প্রয়োগ করার স্থান চিকিৎসকের নজরে আনা দরকার। যদি ইনজেকশনের স্থানে এমনটি ঘটে কিংবা ফুলে যায় অথবা কোনো ক্ষত, প্রদাহ কিংবা ফোসকা পড়ে, তবে সেখানে ইনজেকশন দেওয়া যাবে না।
চামড়া পরিষ্কার করুন
ইনজেকশন দেওয়ার আগে স্থানটি পরিষ্কার কিনা দেখে নিতে হবে। অপরিচ্ছন্ন চামড়ায় ইনসুলিন দিলে ইনফেকশন হতে পারে। পরিষ্কার হাতে চামড়া পরিষ্কার-পূর্বক ইনসুলিন প্রয়োগ করতে হবে। তুলোর বল নিরাপদ পানিতে কিংবা অ্যালকোহলে ভিজিয়ে স্থানটি পরিষ্কার করতে হবে। পরিষ্কার করার সময় কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে পরিষ্কার করে দিতে হয়। অ্যালকোহল শুকিয়ে যাওয়ার পর তবে ইনজেকশন দিতে হবে।
সিরিঞ্জ ব্যবহারে সতর্কতা
সিরিঞ্জ ব্যবহারে সতর্ক হোন। যাদের হাতে ক্ষত কিংবা প্রদাহ রয়েছে, তারা বারবার একই সিরিঞ্জ ব্যবহারের ঝুঁকি নেবেন না। একজনের সিরিঞ্জ অন্যজনে ব্যবহার করা যাবে না।
ব্যবহারের পর
ইনজেকশন নেওয়ার পর সুঁই ক্যাপের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতে হবে। এটি যাতে অন্য কিছুর সংস্পর্শে না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফ্রিজে কখনও সুঁই খোলা অবস্থায় রাখা ঠিক হবে না। এতে এর ভেতর দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে আটকে যেতে পারে, যা ইনসুলিনের মাত্রায় গোলযোগ পাকাতে পারে। যখন সুঁই ভোঁতা হয়ে যায় কিংবা বেঁকে যায় অথবা অন্য কোনো কিছুর সংস্পর্শে আসে, তখন তা ফেলে দিন। সুঁই ফেলে দেওয়ার সময় খুলে ফেলুন। কখনও কেঁচি দিয়ে এটি কাটতে যাবেন না। এতে উড়ন্ত সুঁই এসে চোখমুখে লেগে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। ইনসুলিনের কলম ব্যবহারের পর ফ্রিজে রাখার দরকার নেই।
ইনসুলিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা রাখা
ইনসুলিন প্রয়োগকারীকে অবশ্যই ইনসুলিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা রাখতে হবে। ইনসুলিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হলো– ওজন বৃদ্ধি, চামড়ার পুরুত্ব হ্রাস-বৃদ্ধি, প্রয়োগ স্থলে প্রদাহ, অ্যালার্জি এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া। ইনসুলিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া। রক্তে চিনির মাত্রা প্রতি লিটারে ৩.৯ মিলি মোলের নিচে নেমে গেলে শরীরে অনেক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ক্ষুধার অনুভূতি, বুক ধড়ফড়, অত্যধিক ঘাম
নিঃসরণ, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ, মনোসংযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি, এমনকি চেতনা বিলুপ্তি পর্যন্ত হতে পারে। হাইপোগ্লাসিমিয়ার লক্ষণগুলো প্রকাশিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে চিনি বা গ্লুকোজের শরবত অথবা মিষ্টি শরবত খেয়ে নিতে হবে। বাসায় গ্লুকোমিটার দিয়ে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে নিতে হবে।
লে. কর্ণেল ডা: নাসির উদ্দিন, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ইনসুলিন
- ডায়াবেটিস
- ডায়াবেটিস চিকিৎসা
