বিশ্বকাপে মেসি-যুগের সূর্যাস্ত আজ
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৭ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৩৪
হাডসন নদীর বুক চিরে যখন শেষ বিকেলের বিষণ্ন ফেরিটি ওপারে চলে যায়, এপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তবুও ঘাটে অপেক্ষা করে; আশায় থাকে, আগামীকালের এক নতুন ভোরে ফেরিটি ঠিক ফিরে আসবে চেনা আঙিনায়। কিন্তু যে সূর্য বিদায়ের ওপারে ডুব দেয় আর কোনোদিন ফিরে আসবে না বলে, সেই গোধূলি তো কেবলই বুকের ভেতরের ক্ষত আর চাপা কষ্টটুকু বাড়িয়ে দিয়ে যায়। যেমনটি বাড়িয়ে দিয়ে যায় বিশ্বকাপের বালুচরে মেসির শেষ পায়ের ছাপ। কোথাও ঘোষণা দেননি, তবে সবাই জানেন– স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপ ফাইনালটিই হতে যাচ্ছে মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। যে ম্যাচটির মধ্যে এক ধরনের গৌরবময় বিষাদ লুকিয়ে আছে, ক্যানভাসের সমস্ত রং ফুরিয়ে আসার আগে এক শতাব্দী-সেরা জাদুকর আজ তাঁর নোঙর ছেঁড়া তরণি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফুটবল ইতিহাসের শেষ ঘাটে।
গত দুই দশকে বিশ্বকাপের মাঠে যিনি তুলির শেষ আঁচড়ে ম্যাজিক রিয়েলিজম ফুটিয়ে তুলেছেন, সেই লিওনেল মেসির মহিমান্বিত সাম্রাজ্যে আজ শেষ গোধূলির আলো। একে ঠিক ‘অবসর’ বলা ভুল হবে, এ যেন এক রাজকীয় সূর্যাস্ত। যে স্পেনের মাটিতে বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় তাঁর রক্ত-মাংসের ফুটবল সত্তা গড়ে উঠেছিল, আজ নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস যে, সেই স্পেনের বিপক্ষেই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ যুদ্ধ! লুইস দে লা ফুয়েন্তের তরুণ স্পেন দল হয়তো ট্যাকটিসের ছকে মেসিকে আটকাতে চাইবে; কিন্তু ফুটবল-বিধাতা যেখানে নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখেছেন, সেখানে ছকের কী বা মূল্য? ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে নোভাক জকোভিচ কিংবা টম ব্রাডি– নিউইয়র্কের হাই-প্রোফাইল ফ্যানাটিকস ফেস্টে হাজির হওয়া জগতের সমস্ত দিকপাল আজ এই রাজপুত্রের শেষ বিদায়ের সাক্ষী হতে উদগ্রীব।
গতকাল রাতে ম্যানহাটানে ‘ফ্যানাটিকস ফেস্ট’-এ মজার একটি পর্ব আয়োজন করেছিল ফিফা। যেখানে কিংবদন্তিদের কাছে কিংবদন্তিদের জিজ্ঞাসা, যেন এক অলৌকিক উপাসনালয়। সারাবিশ্বের তাবড় তাবড় সব লিজেন্ড এক ছাদের নিচে জড়ো হয়েছিলেন; কিন্তু তারা কেউ এদিন নিজের আলো ছড়াতে আসেননি; এসেছিলেন বিশ্বফুটবলের এক মহিমান্বিত সূর্যের শেষ অস্তরাগ দেখতে। আমেরিকান ফুটবলের অবিসংবাদিত সম্রাট টম ব্রাডি, বাস্কেটবলের জাদুকর কেভিন ডুরান্ট থেকে শুরু করে টেনিসের জীবন্ত কিংবদন্তি নোভাক জকোভিচ কিংবা পপ সংস্কৃতির আইকন শাকিরা– কে ছিলেন না সেখানে? কিন্তু সেই চাঁদের হাটে যখন লিওনেল মেসি এসে দাঁড়ালেন, চারপাশের সমস্ত আলোর রোশনাই যেন এক নিমেষে ফিকে হয়ে গেল। না, চেনা সেই দাম্ভিক রাজকীয়তা তাঁর মধ্যে ছিল না। ৩৯ বছর বয়সের মেসিকে দেখাচ্ছিল এক পরম শান্ত, সৌম্য ও তপস্বীর মতো। হালকা ছাঁটা দাড়ি আর চোখের কোণে এক অদ্ভুত মায়া নিয়ে যখন তিনি মঞ্চে উঠলেন, মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক অলৌকিক মিশনের শেষ পাতাটি পড়তে এসেছেন।
মঞ্চের ব্যাকস্টেজে টম ব্রাডি যখন পরম বিস্ময়ে মেসির দিকে তাকিয়ে সেই শৈশবের ভাইরাল ছবির গল্প (যেখানে মেসি শিশু ইয়ামালকে স্নান করাচ্ছেন) তুললেন, মেসি মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন– যেন বলছেন ‘জীবন বড় অদ্ভুত!’ আর যখন টেনিস-সম্রাট নোভাক জকোভিচ এগিয়ে এসে মেসির কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলেন– এত বছর ধরে কোটি মানুষের প্রত্যাশার পাহাড় কীভাবে সামলান? মেসি স্বভাবসুলভ লাজুক হেসে আকাশের দিকে আঙুল তুললেন। উত্তর পেয়ে জকোভিচ যেন এক গভীর আধ্যাত্মিক দীক্ষা নিলেন এবং শ্রদ্ধাভরে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘গ্রাসিয়াস, লিও’ (ধন্যবাদ লিও)। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও মেসিকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। তবে এটিই মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ– সেটি বলার ঝুঁকি নেননি। গতকাল এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, আমরা কি ধরে নিতে পারি, এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ? উত্তরে স্কালোনি বলেন, ‘দেখুন, মেসি বারবার আমাদের চমক দিয়ে যায়। তাঁকে যত কাছ থেকে দেখি, তত বিস্মিত হই। আর যে শেষ ম্যাচের কথা বলছেন, তার উত্তর মেসিই দিতে পারবেন। আর কেউ নন।’
২০০৬ সালের জার্মানির সেই চেনা ঘাসে যখন ১৯ বছরের এক লাজুক কিশোর প্রথম পা রেখেছিল, বিশ্বফুটবল কি তখন জানত– তিনি আসলে কোনো সাধারণ ফুটবলার নন, এক অলৌকিক ইতিহাসের লিপিকার? দীর্ঘ দুই দশক ধরে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সেই আকাশি-নীল জার্সিকে যিনি নিজের হৃৎপিণ্ড বানিয়ে নিয়েছেন, আজ তাঁর বিদায়বেলায় পরিসংখ্যানগুলো স্রেফ সংখ্যা নয়; একেকটা অমর কীর্তিগাথা। ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৩টি ম্যাচ খেলার সেই অবিশ্বাস্য গ্র্যান্ড রেকর্ড বুকে নিয়ে, বিশ্বমঞ্চে ২১টি চোখধাঁধানো গোল আর ১২টি জাদুকরি অ্যাসিস্টের এক অনন্য চূড়ায় আজ একাকী দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। ২০১৪ আর ২০২২ সালের বিশ্বকাপে দু-দুটি গোল্ডেন বলের রাজমুকুট মাথায় পরে, রেকর্ড ১৪ বার ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার যে অলৌকিক কীর্তি তিনি গড়েছেন, তা হয়তো কোনোদিন আর ছোঁয়া যাবে না।
কিন্তু এসব রাজকীয় সংখ্যাকেও ছাপিয়ে চোখ বুজলে আজ কোন ছবিটা মনে পড়ে? কাতার বিশ্বকাপের সেই সেমিফাইনালে লুসাইল স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার জোসকো গাভার্দিওলকে উইং লাইনে নাচিয়ে, কোমর দুলিয়ে, বোকা বানিয়ে হুলিয়ান আলভারেজের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া সেই অতিপ্রাকৃতিক অ্যাসিস্ট? নাকি এই ২০২৬ বিশ্বকাপে, ৩৯ বছর বয়সে এসেও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেই ইতিহাস গড়া গোলটি করে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে টপকে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন একাই কেড়ে নেওয়া? বার্সার সঙ্গে ন্যাপকিনে সই করা সেই দিনটি থেকে আজ পর্যন্ত সময় থমকে গেছে শুধু এই একটি মানুষের পায়ের জাদুতে। ট্রফি তো অনেকেই জেতে, কিন্তু ফুটবলকে প্রতিদিন এভাবে সুন্দর করে তোলার ঐশ্বরিক দায় কেবল মেসি তাঁর নিজের হাতেই রেখেছিলেন।