শতবর্ষী উৎসবে মাতবে পরের বিশ্বকাপ
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১৫:০১
শুরুর অপেক্ষাতেই বোধ হয় সব আনন্দ লুকিয়ে, বিদায়ে কেবলই এক ভাঙা হাটের বিষণ্ণ গোধূলি আর জমা হওয়া স্মৃতির কোলাজ। কত অবিশ্বাস্য ড্রামা, কত রূপকথার মতো উত্থান আর মহাতারকাদের নিঃশব্দ পতনের সাক্ষী হয়ে অবশেষে শেষ হলো উত্তর আমেরিকার মেগা সংস্করণের ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ। তবে ফুটবলের চিরাচরিত নিয়মেই এক সান্ধ্যকালীন সূর্যাস্তের ওপারেই লুকিয়ে থাকে এক নতুন ঊষালগ্নের আবাহন। হাডসনের কনকনে শীতল হাওয়া আর মেটলাইফের কোলাহলকে পেছনে ফেলে ফুটবল এবার পাড়ি জমাচ্ছে এক নজিরবিহীন, অতলান্তিক-পেরোনো এক শতাব্দী-সেরা মহাযজ্ঞের আঙিনায়। পরের বিশ্বকাপ ২০৩০ সালের সেই বহু বর্ণিল শতবর্ষী বিশ্বকাপ মাতবে মহাদেশের পাঁচিল পরিয়ে ছয়টি দেশে।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে টুর্নামেন্টের শুরুর দিকের তিনটি বিশেষ ম্যাচ দক্ষিণ আমেরিকার এই তিনটি দেশে খেলা হবে। প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক ও চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উরুগুয়ে, প্রথম বিশ্বকাপের রার্নাসআপ হিসেবে আর্জেন্টিনা, আর লাতিন ফুটবলের সদরদপ্তর হিসেবে প্যারাগুয়েতে পরের বিশ্বকাপের শুরুর কিছু ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে শতবর্ষী ওই আসরের মূল তিন আয়োজক দেশ স্পেন, পর্তুগাল আর মরক্কো।
আপাতত যা সিদ্ধান্ত, তাতে পরের বারও বিশ্বজয়ের মূল মঞ্চে ৪৮টি দেশেরই অবর্তীণ হওয়ার কথা। তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সম্প্রতি সুইস গণমাধ্যম ব্লুইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংখ্যাটা ৬৪ হলেও হতে পারে। উত্তর আমেরিকার এ মহাযজ্ঞ সফলভাবে শেষ হওয়ার মুখেই তিনি জানিয়েছেন ৬৪ দলের বিশ্বকাপ করার বিষয়টি ফিফা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
শুধু দলের সংখ্যা নয়, আসল চমকটা লুকিয়ে রয়েছে এর ভৌগোলিক ক্যানভাসে। তিনটি শতবর্ষী ভেন্যুসহ মোট ১৭ থেকে ১৮টি ঐতিহাসিক শহরের ২০ থেকে ২৩টি চোখ ধাঁধানো স্টেডিয়ামে ম্যাচ গড়াবে। মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু থেকে শুরু করে কাসাব্লাঙ্কার বুক চিরে গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম ১১৫,০০০ আসনের গ্র্যান্ড স্টেড হাসান টু–সব মিলিয়ে এক অবিশ্বাস্য, নজিরবিহীন এক গোলকধাঁধা অপেক্ষা করছে পরের বিশ্বকাপে। যা শুরু হতে পারে ২০৩০ সালের ৮ জুন থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত।
ম্যানহাটানে গত শনিবার বিশ্বের প্রায় দুইশরও বেশি সদস্য দেশের কর্তাদের নিয়ে ‘ফিফা মেম্বার অ্যাসোসিয়েশন (এমএ) এক্সিকিউটিভস ব্রেকফাস্ট’ ইভেন্টে বসেছিলেন ইনফান্তিনো। সেখানে শুধু এবারের আসরের হিসাবনিকাশ মেলাননি, মিলিয়েছেন তাঁর আগামী মেয়াদের মসনদের নিষ্কণ্টক নিশ্চয়তাও। দুইশর বেশি দেশের অলিখিত ব্যালট পেপার পকেটে পুরে ইনফান্তিনো যখন হাসেন, তখন বোঝা যায় ফিফার মসনদে তাঁর একাধিপত্য কতটা অটুট। সেই রাজকীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইনফান্তিনো ছুড়ে দেন অবিশ্বাস্য কিছু সংখ্যার জাদু। গ্যালারিতে প্রায় ৭০ লাখ দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার, স্টেডিয়ামের ৯৯.৭ শতাংশ অভূতপূর্ব অকুপেন্সি রেট আর সামাজিক মাধ্যমে দুই কোটির বেশি ফেসবুক-ডিজিটাল এনগেজমেন্ট হয়েছে এবার। যা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে।
তবে আসল নাটকীয়তা ছিল তাঁর সাফল্যের আত্মোপলব্ধিতে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নিন্দুকদের যে তীব্র নেতিবাচক প্রচার আর আশঙ্কার কালো মেঘ ফরাসি-আমেরিকান মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছিল, সেটিকে তিনি কীভাবে এক তুড়িতে ধূলিসাৎ করেছেন, তার এক বিস্ফোরক বিবরণ দিলেন ইনফান্তিনো। ‘আপনারা হয়তো টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অনেক সন্দেহ, সমালোচনা এবং আরও কত কী পড়েছিলেন– স্টেডিয়ামগুলো নাকি ফাঁকা থাকবে, (দর্শকদের) ভিসা পাওয়া যাবে না, দলগুলো ঠিকমতো খেলতেই পারবে না এবং আরও কতশত কথা। অথচ সবকিছু ঠিক তার উল্টোভাবে কাজ করেছে। আমরা সমস্ত সমালোচকের মুখ বন্ধ করে দিয়েছি। এই খেলার শক্তি, ফুটবলের জাদু পুরো টুর্নামেন্টকে আপন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।’
গর্বের হাসি হেসে ফিফা সভাপতি বুঝিয়ে দেন, মেগা সংস্করণের চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে তিনি জিতেছেন। কাতারে শুধু একটি শহরে পুরো বিশ্বকাপ করিয়েছেন। এবার তিন দেশে প্রথমবারের মতো ৪৮ দেশ নিয়ে আসর গড়িয়েছেন। এবং পরের বার তিন মহাদেশের চ্যালেঞ্জ নিতেও তৈরি আছেন।
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
- ফিফা