থাইরয়েড হরমোন বৃদ্ধিজনিত বিপত্তি
ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়া সচল রাখার জন্য থাইরয়েড হরমোন অপরিহার্য। গলার সামনে অবস্থিত এ গ্রন্থিটি যখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হরমোন তৈরি করে, তখন শরীরের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলো অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হতে থাকে। এ অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘থাইরোটক্সিকোসিস’ বা হাইপার-থাইরয়েডিজম। এটি একটি অত্যন্ত জটিল অবস্থা, যা সাধারণত নারীর মধ্যে অধিক হারে দেখা যায়। যখন থাইরয়েড গ্রন্থির নিঃসরণ বেড়ে যায়, তখন শরীর অতিরিক্ত শক্তির ব্যবহার করতে থাকে। যার ফলে রোগীর ওজন খুব দ্রুত কমতে শুরু করে। অতিরিক্ত ঘাম নিঃসরণ ও গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাওয়া এ রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
থাইরোটক্সিকোসিসের রোগীদের মেজাজ খুব খিটখিটে হয়। তারা সব সময় অস্থিরতায় ভোগেন এবং বুক ধড়ফড় করার সমস্যায় আক্রান্ত হন। হাতের তালু ঘামানো, নখ ক্ষয়ে যাওয়া এবং চুল পড়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য তৈরি হয়, যা হার্টের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। যাদের আগে থেকেই হৃদরোগজনিত জটিলতা আছে, তাদের জন্য এ অবস্থা মৃত্যুর ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ ছাড়া নারীর মাসিকে অনিয়ম, বন্ধ্যত্ব কিংবা বারবার গর্ভপাতের মতো জটিল সমস্যাও এই হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে হতে পারে। পেশির ক্ষয়ের কারণে বসা থেকে ওঠার সময় কষ্ট হওয়া এবং দ্রুত হাড় ক্ষয়ে যাওয়া এ রোগের গুরুতর প্রভাবগুলোর মধ্যে একটি। অনেক সময় রোগীর ঘনঘন পায়খানার সমস্যা হয়, যা অনেকেই সাধারণ সমস্যা ভেবে ভুল করেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ লক্ষণ দেখা দেয় গ্রেভস ডিজিজের ক্ষেত্রে, যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং চোখের অক্ষিগোলক বড় হয়ে কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা তৈরি হয়। এ ধরনের রোগীর দ্রুত সুচিকিৎসা প্রয়োজন। হাইপার-থাইরয়েডিজমের চিকিৎসার জন্য প্রধানত তিন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে–ওষুধের মাধ্যমে হরমোন নিয়ন্ত্রণ, শল্যচিকিৎসা বা সার্জারি এবং রেডিও-আয়োডিনথেরাপি। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং রোগের কারণ বিবেচনা করে চিকিৎসার ধরন নির্ধারণ করেন চিকিৎসক। ক্ষেত্রবিশেষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার মাধ্যমে এ হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা হয়। থাইরয়েড হরমোনের সামান্য তারতম্য পুরো শরীরের বিপাকীয় ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিতে পারে। তাই কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হরমোন বা এন্ডোক্রাইন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। সময়মতো সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে হাইপার-থাইরয়েডিজম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে
রাখা সম্ভব।
লেখক: মেডিসিন স্পেশালিস্ট ও এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট
- বিষয় :
- থাইরয়েড