ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি পাঁচ জনের একজন শিশু
সবচেয়ে বেশি রোগী বরিশালে
প্রতীকী ছবি
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৮ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডেঙ্গু সংক্রমণ এবার নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে শিশুদের নিয়ে। চলতি বছরের তথ্য বলছে, দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের একজনই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষা বাড়ায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। একই সময়ে নতুন করে ৯৪ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৭০ জন।
প্রতি পাঁচজনে একজন শিশু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট আক্রান্তের মধ্যে এক হাজার ৮১৮ জনের বয়স ১৫ বছর বা এর কম, যা মোট রোগীর প্রায় ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের একজন শিশু। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৫৮৪ শিশু আক্রান্ত হয়েছে, যা মোট রোগীর প্রায় ৬ শতাংশ। ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী আক্রান্ত ৫৬৩ জন এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৬৬৩ জন।
অন্যদিকে, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ৮৬৪। সব মিলিয়ে ৩০ বছরের কম বয়সী রোগী পাঁচ হাজার ৬৮০, যা মোট আক্রান্তের ৫৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ও কর্মক্ষম তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে।
ঢাকার বাইরে দ্রুত ছড়াচ্ছে সংক্রমণ
এ বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সংক্রমণের ভৌগোলিক বিস্তারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের ৭৬ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। সবচেয়ে বেশি রোগী বরিশাল বিভাগে দুই হাজার ৪৪৩ জন, যা মোট আক্রান্তের ২৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি চারজন রোগীর একজনই বরিশাল বিভাগের।
এর পর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে এক হাজার ৭২১ জন, খুলনায় এক হাজার ২৭৬, ময়মনসিংহে ৩৩৯, রাজশাহীতে ৩২৪, সিলেটে ৮০ এবং রংপুর বিভাগে ৭৪ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৯১২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।
রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ থেকে জাতীয় সংকট
একটা সময় ডেঙ্গু মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরের তথ্য বলছে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। ২০২১ সালে মোট আক্রান্তের মাত্র ১৬ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরের। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছর সেই হার বেড়ে হয়েছে ৭৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা প্রমাণ করে, ডেঙ্গু এখন দেশের প্রায় সব অঞ্চলের স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
ঢাকার শ্যামলীর ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ২০১৫ সালের আগে ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। এরপর ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে।
আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বাড়তে পারে প্রকোপ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশার ঘনত্ব, রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে নিয়মিত পূর্বাভাস তৈরি করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেন, এখনই মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থায়ী সমাধানে ঘাটতি কাটাতে হবে
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ২৫ বছরেও ঢাকায় কার্যকরভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরও সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হবে।
তাঁর মতে, মশক নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ, আধুনিক গবেষণাগার এবং প্রশিক্ষিত কীটতত্ত্ববিদের অভাব রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর না করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য আসবে না।
- বিষয় :
- ডেঙ্গু
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর