উদ্ভাবন
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডেন-এক্স ট্র্যাপ
দেশীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন জাবির গবেষকরা সমকাল
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত কীটনাশক ছিটানো, ফগিং, লার্ভার উৎস ধ্বংস ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চললেও মশার বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও নানা ধরনের পানির আধার এডিসের নতুন প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধক্ষমতা। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করে নতুন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের (আইআরইএস) গবেষকরা তৈরি করেছেন ‘ডেন-এক্স ট্র্যাপ’। মশা গবেষক অধ্যাপক ডা. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ বছরের গবেষণার ফল এই ফাঁদ। গবেষকদের দাবি, এটি কীটনাশকনির্ভর নয়; বরং এডিস মশার স্বাভাবিক প্রজনন আচরণ কাজে লাগিয়ে এর জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত করে।
ডেন-এক্স ট্র্যাপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর আকর্ষক উপাদান। বাজারে প্রচলিত অনেক মশার ফাঁদে কৃত্রিম রাসায়নিক বা ব্যয়বহুল লিউর ব্যবহার করা হলেও এতে ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের দেশীয় উদ্ভিদ থেকে তৈরি প্রাকৃতিক আকর্ষক।
গবেষকরা গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শতাধিক দেশীয় উদ্ভিদ পরীক্ষা করেছেন। এসব উদ্ভিদের নির্যাস ও গন্ধ এডিস মশার ডিম পাড়ার আচরণে কী প্রভাব ফেলে, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এমন দুটি দেশীয় উদ্ভিদের সমন্বয় শনাক্ত করা হয়েছে, যা স্ত্রী এডিস মশাকে ফাঁদের ভেতরে ঢুকে ডিম পাড়তে আকৃষ্ট করে।
স্ত্রী এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার, স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। ডেন-এক্স ট্র্যাপে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়, যা মশার কাছে নিরাপদ প্রজননস্থলের মতো মনে হয়। আকর্ষক উপাদানের টানে মশা সেখানে ঢুকে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা বের হলেও বিশেষ ব্যবস্থার কারণে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হতে পারে না। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্মের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানান, এটি কোনো স্প্রে বা বিষ নয়; মশার নিজস্ব আচরণকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, ব্যাটারি, মোটর বা জটিল যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয় না। দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচও তুলনামূলক কম। প্রযুক্তিটির জন্য পেটেন্টের আবেদনও করা হয়েছে।
গবেষণাগারের বাইরে দেশের বিভিন্ন পরিবেশে ডেন-এক্স ট্র্যাপের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভারের আবাসিক এলাকা, ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্থান, চট্টগ্রামের কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনসহ বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালানো হয়। মশার আকর্ষণ, ডিম পাড়ার হার, লার্ভার বিকাশ এবং স্থানীয় এডিসের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করে ট্র্যাপের নকশা ও আকর্ষক উপাদানে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এরই মধ্যে বাস্তব জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। ইউনিসেফের সহায়তায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ডেন-এক্স ট্র্যাপ বসানো হচ্ছে। ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও বিভিন্ন পানির পাত্রের কারণে এসব এলাকায় এডিসের প্রজননের ঝুঁকি বেশি।
গবেষকরা বলছেন, ডেন-এক্স ট্র্যাপ প্রচলিত কীটনাশকনির্ভর পদ্ধতির বিকল্প নয়; বরং সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনায় এটি একটি কার্যকর সহায়ক প্রযুক্তি হতে পারে। কম খরচে তৈরি এবং কয়েক বছর পুনর্ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে।