ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরীক্ষার্থী ১৭ লাখ, খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ৪ লাখের বেশি

পরীক্ষার্থী ১৭ লাখ, খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ৪ লাখের বেশি
×

গীতু মোজা নামের এক অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, তার মেয়ে সঠিক উত্তর দেওয়ার পরও অন্তত ৩০ নম্বর কম পেয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

দ্য গার্ডিয়ান

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬ | ১৩:২৮ | আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ | ১৫:০৩

ভারতে স্কুল-সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। পরীক্ষায় ভালো করার পরও প্রত্যাশিত নম্বর না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। কেউ বলছেন, উত্তরপত্রের পৃষ্ঠা নেই; কেউ দাবি করছেন- যে খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে সেটিই তার নয়। নতুন ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি ঘিরে তৈরি হওয়া এই সংকট দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের (সিবিএসই) দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। ফল ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী নিজেদের উত্তরপত্র ও মূল্যায়নের কপি চেয়ে আবেদন করেন। প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এই ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নম্বর নিয়ে সামান্য অসঙ্গতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

কেন শুরু হলো বিতর্ক?

এবার প্রথমবারের মতো পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে চালু করা হয় ‘অন-স্ক্রিন মার্কিং’ বা ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি। এতে পরীক্ষার উত্তরপত্র স্ক্যান করে অনলাইনে আপলোড করা হয়। এরপর শিক্ষকরা ডিজিটাল মাধ্যমে খাতা মূল্যায়ন করেন এবং সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোট নম্বর গণনা করে। শিক্ষা বোর্ডের দাবি, এই পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল ভুল কমানো এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থা তাদের জন্য উল্টো বিভ্রান্তি ও ক্ষতির কারণ হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, স্ক্যান করা উত্তরপত্রে পৃষ্ঠা ছিল না, কোথাও লেখা অস্পষ্ট ছিল, আবার কোথাও ভুল নম্বর যোগ করা হয়েছে। কেউ কেউ এমনও দাবি করেন, তাদের নামে অন্য শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র পাঠানো হয়েছে।

এক শিক্ষার্থীর অভিযোগে শুরু হয় ঝড়

দিল্লির শিক্ষার্থী বেদান্ত শ্রীবাস্তবের একটি পোস্ট থেকে বিষয়টি আলোচনায় আসে। তিনি জানান, উত্তরপত্রের কপি চাওয়ার পর পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার যে খাতা তাকে পাঠানো হয়েছে, সেটি তার নয়। হাতের লেখা তার সঙ্গে মেলে না এবং সেখানে এমন উত্তর রয়েছে, যা তিনি লেখেননি।

এক আবেগঘন পোস্টে তিনি লেখেন, 'আমি পুরো এক বছর পড়াশোনা করেছি। ঘুম, মানসিক শান্তি, বন্ধুদের সঙ্গে সময়- সবকিছু ত্যাগ করেছি এই পরীক্ষার জন্য। অথচ এখন আমি জানিই না আমার আসল খাতাটি আদৌ মূল্যায়ন করা হয়েছে কিনা।'

তার অভিযোগ ভাইরাল হওয়ার পর আরও অনেক শিক্ষার্থী একই অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে শুরু করেন। সামাজিকমাধ্যমে তারা এমন সব স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন, যেখানে ভুল নম্বর, পৃষ্ঠা নেই কিংবা অন্যের উত্তরপত্র পাওয়ার অভিযোগ দেখা যায়। পরে শিক্ষা বোর্ড বেদান্তকে ই-মেইলে তার উত্তরপত্রের ‘সঠিক কপি’ পাঠায়।

অভিভাবকদের উদ্বেগ

ফলাফল নিয়ে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। গীতু মোজা নামের এক অভিভাবক সামাজিকমাধ্যমে অভিযোগ করেন, তার মেয়ে সঠিক উত্তর দেওয়ার পরও অন্তত ৩০ নম্বর কম পেয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'কর্তৃপক্ষ কি বুঝতে পারছে, দ্বাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর জন্য ৩০ থেকে ৩৫ নম্বর কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে পুরো ভবিষ্যৎ এই ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। এভাবে হাজারো শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার, মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করা হচ্ছে।'

প্রস্তুতির অভাব?

সমালোচকদের মতে, সমস্যার অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব। কারণ নতুন ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতির ঘোষণা দেওয়া হয় পরীক্ষা শুরুর মাত্র ৮ দিন আগে। ফলে শিক্ষক ও মূল্যায়নকারীরা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় পাননি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং ত্রুটিমুক্ত সফটওয়্যার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ভুল কমানোর বদলে নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি হবে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

বিতর্ক বাড়তে থাকায় ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, নতুন ব্যবস্থায় কিছু অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, সমস্যার সমাধান করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন

ভারতে ডিজিটাল শিক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রসারকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনা দেখিয়েছে, প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি জবাবদিহি, নির্ভুলতা এবং মানবিক তদারকি সমান গুরুত্বপূর্ণ। লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত এমন একটি পরীক্ষায় সামান্য ত্রুটিও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এখন প্রত্যাশা- অভিযোগগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।

আরও পড়ুন

×