ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

বিচ্ছিন্ন শহরের দিনলিপি

বিচ্ছিন্ন শহরের দিনলিপি
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২০ | ০৪:০৭ | আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২০ | ০৮:২৫

চীনের উহান শহরের কথা এখন আর বিশ্বের অজানা নেই। কারণ এখান থেকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে। গোটা দুনিয়ায় এটি নিয়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। এরই মধ্যে উহান শহরের সঙ্গে চীনের অন্যান্য অঞ্চল তথা বিশ্বের অন্য দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছে দেশটির সরকার। 

সম্প্রতি উহান শহরে বসবাসরত জিও জিং নামের ২৯ বছরের এক চীনা নারী বিচ্ছিন্ন শহর উহানে কাটানো দিনগুলোর কথা তুলে ধরেছেন বিবিসির কাছে। 

করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ২৩ জানুয়ারি উহান শহরের যাতায়াত ব্যবস্থা, বেশিরভাগ দোকান, ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে লোকজনকে নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। সমাজকর্মী জিও জিং ওই শহরে কাটানো এক সপ্তাহের দিনলিপি শেয়ার করেছেন বিবিসির সঙ্গে। তার সেই দিনলিপির অংশবিশেষ এখানে-

২৩ জানুয়ারি- যেদিন থেকে বিচ্ছিন্ন 

ঘুম থেকে উঠেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানতে পারলাম। এটার মানে কি, কতক্ষণ এভাবে থাকতে হবে বুঝতে পারছিলাম না। চারদিক থেকে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া পাচ্ছিলাম। জায়গা না থাকায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছিলেন না। জ্বরে আক্রান্তরাও ঠিক মতো চিকিৎসা পাচ্ছিলেন না। 

বেশিরভাগ মানুষ মাস্ক পরে বের হচ্ছিল। বন্ধুরা আমাকে বেশি করে জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে বলে। বেশিরভাগ দোকানে চাল আর নুডলস শেষ হয়ে যায়। ওষুধের দোকানেও মাস্ক পাওয়া যাচ্ছিল না। খাবার মজুদ করার পরও আমার ধাক্কা কাটছিল না। হঠাৎ করে গোটা শহর বন্ধ হয়ে গেল। কবে আবার এ শহর জেগে উঠবে?

২৪ জানুয়ারি- নীরব নিউ ইয়ার ইভ

গোটা পৃথিবী শান্ত হয়ে গেছে। এ নীরবতা খুব ভীতিকর। আমি একা থাকি। মাঝেমধ্যে করিডোরে আমি অন্য মানুষের শব্দ পাচ্ছিলাম। কীভাবে বাঁচবো সেই চিন্তা করছিলাম। কোনোভাবেই আমি অসুস্থ হতে চাই না। সরকার থেকে জানানো হয়নি কতদিন এ অবস্থা চলবে। অনেকে বলছিল মে মাস পর্যন্ত এ অবস্থা থাকতে পারে। বেশিরভাগ ওষুধের দোকান, মার্কেট আজ বন্ধ। সুপারমার্কেটের নুডলস সব বিক্রি হয়ে গেছে। তবে কয়েকটি দোকানে চাল আছে।

বাড়িতে ফিরে গোসল সেরে সব কাপড়চোপড় পরিষ্কার করলাম। দিনে এখন ২০ থেকে ৩০ বার হাত পরিষ্কার করছি।বাইরে বের হয়ে মনে হচ্ছিল, এখনও পৃথিবীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। এ পরিস্থিতি একাকী বাস করা বয়স্করা ও প্রতিবন্ধীরা কেমন আছেন তা কল্পনাই করতে পারছি না। রাতের খাবারের পর বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করলাম। তিন ঘণ্টার মতো কথা বলে খুশী মনে ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই ফ্ল্যাশব্যাকের মতো গত কয়েকদিনের কথা মনে হলো।

চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। নিজেকে অসহায়, দুঃখী মনে হচ্ছিল। আবার রাগও হচ্ছিল। মৃত্যুর কথাও চিন্তা করলাম। এভাবে মরতে চাই না।

হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

২৫ জানুয়ারি- চীনা নববর্ষ

আজ চীনা নববর্ষের দিন। কোনোদিন উৎসব উদযাপন নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল না। কিন্তু এবারের নিউ ইয়ার কেমন যেন খাপছাড়া মনে হচ্ছিল। সকাল বেলা হাঁচির সঙ্গে রক্ত দেখে ভয় পেয়েছি। অসুস্থতার ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি। বাইরে যাব কিনা বুঝতে পারছি না। আমার জ্বর নেই, খাওয়াদাওয়াতেও সমস্যা নেই-তাই বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। 

দুইটি মাস্ক পরে বাইরে গেলাম। একটি ফুলের দোকানে গিয়ে কয়েকটা ফুল কিনলাম। বাইরে খুব কম মানুষ চলাফেরা করছিল। আমি আজও কিছু চাল কিনলাম। সেই সঙ্গে মিষ্টি আলু, সসেজ, লাল-সবুজ শিম, লবণাক্ত ডিম কিনলাম। এক মাসের জন্য যথেষ্ট খাবার আমার কাছে মজুদ আছে। নদীর তীরে গেলাম। এখানে দুটি শপ খোলা ছিল। কয়েকজন মানুষ তাদের কুকুর নিয়ে হাঁটাচলা করছিল। 

২৬ জানুয়ারি- কণ্ঠস্বর শোনা

শুধু শহরই ফাঁদে আটকা পড়েনি, মানুষের কণ্ঠস্বরও আটকা পড়েছে। বিছিন্ন হওয়ার প্রথম দিন থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সামাজিক মাধ্যমে কিছু লিখিনি। এমনকী উইচ্যাটেও কিছু লিখিনি। চীনে মাঝেমধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর দীর্ঘসময় নিষেধাজ্ঞা থাকে। কিন্তু এখন এটা অনেক বেশি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। আজ আবার বাড়ির বাইরে গেছিলাম। কতজন মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে সেটা গোনার চেষ্টা করলাম। মাত্র দুমাস হয় আমি উহানে এসেছি। এখানে আমার খুব বেশি বন্ধু নেই। শহরটিও আমি এখনও ভালো করে দেখেনি। আমি আরও কিছুক্ষণ ঘুরতে চাই। 

আজ মনে হয় ১০০ লোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। বন্ধুরা, আশা করি ভবিষ্যতে আবার আমাদের দেখা ও কথা হবে। রাত ৮ টার দিকে বিভিন্ন বাড়ির জানালা থেকে ‘গো, উহান’ চিৎকার শুনেছিলাম। 

২৮ জানুয়ারি- অবশেষে সূর্যের আলো

আজ, অবশেষে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে - ঠিক আমার মেজাজের মতো। আমার বাড়ির সামনের কমপ্লেক্সে অনেক লোক দেখলাম। সেখানে কয়েক জন কমিউনিটি কর্মীও ছিলেন। তারা সবাই অনাবাসিক লোকদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করছিলেন। বেঁচে থাকা নিয়ে আমার উদ্বেগ ধীরে ধীরে কমে আসছে। আমি যদি এখানকার লোকের সঙ্গে কোনো সংযোগ না রাখি তাহলে এ শহরে হেঁটে বাড়ানো অর্থহীন। 

সামাজিক অংশগ্রহণ এখন খুবই গুরুত্বর্ণ। প্রত্যেককেই সমাজে তার ভূমিকা খুঁজে বের করতে হবে এবং নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে হবে। নিঃসঙ্গ এ শহরে আমাকে আমার ভূমিকা খুঁজে বের করতে হবে।    

আরও পড়ুন

×