ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

করোনার দিনলিপি

মন কাঁদে...

মন কাঁদে...
×

শহীদুল ইসলাম বাচ্চু নিউইয়র্ক থেকে

প্রকাশ: ১২ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। কড়া রোদ, ভাবি 'আজ বোধ হয় ভালো খবর শুনব।' গত দু'মাস ধরে আমার কাছে 'ভালো খবর' মানেই করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যার দৈনিক গ্রাফ। কী এক নির্মম বাস্তবতা! সেই ডিসেম্বরে চীনের এক শহরে এই অদৃশ্য ঘাতক হানা দেয়। তারপর মাত্র দু-তিন মাসেই পুরো পৃথিবীর মানচিত্র গ্রাস করে নেয় ঘাতক করোনা। যেন মাল্টিপেল্গক্সের পর্দায় কোনো এক ভয়ংকর সায়েন্স ফিকশন মুভি।
বছরের শুরুতেই জানুয়ারির ৭ তারিখ সন্ধ্যায় সৌদি আরব (ওমরাহ পালন) থেকে সপরিবারে যখন নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে নামি, সবকিছুই স্বাভাবিক। চিরচেনা ব্যস্ত এই এয়ারপোর্ট এবং মেগাসিটি। তখনও কি আমরা প্রবাসীরা কেউ ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পেরেছিলাম 'নিউইয়র্ক' কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে? স্বজন হারানোর আর্তি ও বেদনায় নিউইয়র্ক এবং পর্যায়ক্রমে নিউ জার্সি, মিশিগান, কানেকটিকাট, ওয়াশিংটন, ইলিনয়, ম্যাসাচুসেটস, পেনসিলভানিয়াসহ সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতাল, নার্সিং হোম, ক্লিনিক ও আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠবে?
গত সপ্তাহে হলিউডের 'কোয়ান্টাম অ্যাপোক্যালিপ্স' মুভি দেখছিলাম। সৌরজগৎ থেকে ধেয়ে আসা এক অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলায় তটস্থ মার্কিন প্রশাসন ও বিজ্ঞানীরা। 'যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীকে বাঁচানোর কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা'- এক কর্মকর্তার অসহায় জিজ্ঞাসার জবাবে তরুণী বিজ্ঞানী বললেন- ÔThis is an incident to remind us how insignificant we are in the entirety of the universe.Õ দুনিয়াজুড়ে করোনার সর্বগ্রাসী ছোবলে আজ আমরা, সমগ্র মানবজাতি সেই রকম তুচ্ছ ও অসহায়।
১০ মে রোববার এই লেখাটি তৈরির সময় রোজকার মতো গভর্নর এন্ড্রো ক্যুমোর প্রেস ব্রিফিং দেখতে বসলাম। আমার 'ভালো খবর' তথা করোনায় নিউইয়র্ক রাজ্যে আজকের 'মৃতের সংখ্যা' জানার জন্য। এই তথ্য জানাটা আমার মতো লাখ লাখ নিউইয়র্কবাসীর জন্য, যারা করোনা-প্রভাবে আপাতত কর্মহীন হয়ে গৃহঅন্তরীণ, অত্যন্ত জরুরি। ক্যুমোর 'Daily FatalityÕ গ্রাফের দিকে তাকিয়ে আরও একবার হতাশ হতে হলো- 'আগের দিন (৯ মে) আরও ২০৭ জন মৃত।' তার আগের ৬ দিনের পরিসংখ্যান যথাক্রমে ২২৬, ২১৬, ২৩১, ২৩২, ২৩০ ও ২২৬! পুরো এপ্রিল মাসে প্রতিদিন এই গ্রাফ ওঠানামা করেছে ৩০০ থেকে ৮০০-এর মধ্যে। ভাবা যায়, উন্নত বিশ্বের একটি শহরে সর্বাধুনিক ও ঈর্ষণীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন ৩০০, ৫০০, ৭০০, ৮০০ কিংবা ১০০০ বা তারও বেশি মানুষ 'নাই' হয়ে যাচ্ছে!
সরকারি সূত্রমতে, ৯ মে পর্যন্ত নিউইয়র্ক রাজ্যে মৃতের সংখ্যা ২৭,২৬৮ এবং মোট করোনা পজিটিভ ৩,৩৮,৪৮৫ জন। এবং পুরো যুক্তরাষ্ট্রে মৃত ৭৮,০৬৪ জন ও আক্রান্ত ১২,৯১,৪১১ জন। অথচ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকেও মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। মার্চ থেকে চিত্র দ্রুতই পাল্টে যেতে থাকে। দুঃখজনক হলো, সেই সময়েও ফেডারেল সরকারকে করোনা প্রতিরোধে তেমন নড়েচড়ে উঠতে দেখা যায়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের জমিনে করোনা-আক্রমণের আশঙ্কাকে একাধিকবার 'ডাউন-প্লে' করেছেন, 'তেমন ক্ষতি হবে না' বলেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনকি এও মন্তব্য করেছেন- 'The virus will go away miraculously
সময়ের এক ফোঁড, অসময়ের দশ ফোঁড়। এটাই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বেলায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলের নেতারা ইদানীং করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দোষারোপ করছেন জোর গলায়। তবে খোদ সরকারি সংস্থা সিডিসি (সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল) ও সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে অন্য কথা। এসব সূত্র মতে, যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস এসেছে মূলত ইউরোপ থেকে, চীন থেকে নয়। মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখা থাকে না, বিশেষত মহামারির। করোনার বৈশিষ্ট্যও তেমনি। 'অ্যান আউটব্রেক এনি হোয়্যার ইজ অ্যান আউটব্রেক এভরিহোয়্যার'- তাদের মন্তব্য।
লকডাউনে ৫৫ দিন ঘরবন্দি। একদিনও ঘরের বাইরে যাইনি। কোনো গ্রোসারিতেও না। গার্বেজ ফেলতে এবং অনলাইনে (ইনস্টাকার্ট অ্যাপ) অর্ডার দেওয়া গ্রোসারির ডেলিভারি গ্রহণ করতে গেটের বাইরে নেমেছি মাত্র। জীবনে এমন দীর্ঘ সময় নিজ ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকিনি। না বাংলাদেশে, না ১০ বছরের প্রবাস জীবনে। মাঝে মধ্যে বিস্ময় জাগে, বহু বছরের বা যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া আসামিরা কারাগারের ছোট্ট সেলে থাকে কীভাবে? কোনো কোনো সেলে তো ভেন্টিলেটরও নেই। আর যেখানে আছে, সেখানে তো সূর্যের আলোও পৌঁছায় না, বন্দিরা তো খোলা আকাশও দেখতে পায় না। রক্ত, মাংস ও অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ কি এভাবে থাকতে পারে? বছরের পর বছর এভাবে থেকেও কি তারা কখনও ক্লস্ট্রোফোবিয়ায় ভোগে না? আমার তো প্রায় সে রকমই এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে গত ১৯ জানুয়ারিতে। এই নিউইয়র্কে। নিজের কর্মস্থল ম্যানহাটনের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল ভবনের এলিভেটরে প্রায় ৩৫ মিনিট একাকী আটকে থাকার স্মৃতি মনে পড়লে এখনও ভয়ে কাঁপি।
কারাবন্দিদের তুলনায় আমরা কত সৌভাগ্যবান। বাইরের পৃথিবী দেখছি। জানালার ফাঁক দিয়ে গাছ-গাছালি দেখি। নীল আকাশে ঝলমলে রোদ দেখি। বিষণ্ণ মেঘ দেখি। পাখি দেখি। আর ঘরের ভেতর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের সান্নিধ্যে আছি সারাক্ষণ। মজার মজার খাবার খাচ্ছি। টিভি দেখছি। ইচ্ছেমতো ইন্টারনেটে ঘুরছি। ফেসবুকে দেশে-বিদেশে থাকা বন্ধু-বান্ধব, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে জড়িয়ে আছি। করোনাভাইরাসের সৌজন্যে পাওয়া এমন গৃহবাসকে তো ইতিবাচকভাবেই নিতে হয়।
নিচ্ছি। কিন্তু তারপরও! মানুষ কি এভাবে বাঁচে? মন কাঁদে, ঘরের বাইরে পা ফেলার আকুতি কখনও কখনও খুব তীব্র হয়ে খোঁচা মারে। ঘরের কাছে বাঙালি 'ঢাকা গ্রোসারি' কিংবা চায়নিজ লন্ড্রি কিংবা ইউক্লিড সাবওয়ে স্টেশনে যেতে ইচ্ছা করে। মন চায় দোতলা থেকে নিচতলায় নেমে আমার বাড়িওয়ালা আলম ভাই ও সনচিতা ভাবির ঘরে যাই, একটু বৈকালিক আড্ডা দিই। ঘরের কাছে বাঙালি-অধ্যুষিত ওজনপার্ক কিংবা প্রবাসী বাঙালির কলরবে দিনরাত সরব বিখ্যাত জ্যাকসন হাইটসেও যাই। কিন্তু আমাদের শরীরের মতো আমাদের মনও এখন আমরা বন্দি রেখেছি চার দেয়ালের মধ্যে!
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×