মাস্ক, সামাজিক দূরত্বে আবেদন হারাচ্ছে ‘থাই ম্যাসাজ’
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২০ | ০২:৩৭ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ | ০৩:০৭
থাইল্যান্ডের ম্যাসাজ পার্লারের সামনে দাঁড়ালেই সেখানকার কর্মীদের কড়জোরে ‘ওয়াই’ অভিবাদন জানিয়ে গ্রাহকদের অর্ভ্যথনা জানানোর রীতি অনেকদিন ধরেই প্রচলিত। সেই সঙ্গে পার্লারের ভিতরে বাতাসে ভেসে বেড়ানো জেসমিনের গন্ধ ক্রেতাদের মাতোয়ারা করে রাখত। কিন্তু করোনার কারণে সেই দৃশ্য বদলে গেছে। জেসমিনের জায়গা দখল করে নিয়েছে জীবাণুনাশকের গন্ধ। কর্মীদের কমণীয় হাতও এখন আটকা পড়েছে গ্লাভসের আড়ালে।
থাইল্যান্ডের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ কেন্দ্র এই ম্যাসাজ পার্লারগুলো। এখানকার কর্মীদের হাতে ম্যাসাজ করানোর জন্য প্রতি বছরই এখানে হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন। কিন্তু করোনা সংক্রমণের ফলে ম্যাসাজ পার্লারগুলো বহুদিন ধরে প্রচলিত নিয়ম কানুন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। কর্মীদের হাতের কমনীয় স্পর্শের পরিবর্তে এখন থেকে রাবারের গ্লাভসের ছোঁয়া পাবেন গ্রাহকরা। অন্যদিকে ‘ল্যান্ড অব স্মাইল’ খ্যাত ম্যাসাজকর্মীদের হাস্যোজ্জ্বল মুখটিও ঢাকা থাকবে মাস্কের আড়ালে। করোনা এড়াতে এমন স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করায় পর্যটন শিল্পে সেবা গ্রহীতা ও সেবা দাতা উভয় পক্ষই পড়েছেন বিপাকে।
থাইল্যান্ড জুড়ে প্রায় ৭০ টির মতো ম্যাসাজ পার্লার ও স্পা সেন্টার রয়েছে সিয়াম ওয়েলনেস গ্রুপের। এর সভাপতি উইবুন উতসাহিত বলেন, এমন সঙ্কট কখনও দেখিনি। তিনি জানান,করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আগের পদ্ধতিগুলো পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রতিটি রুমে তারা জীবাণুমুক্তকরণ যন্ত্র বসিয়েছেন। এছাড়া স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন সামগ্রী রেখেছেন। তিনি আরও জানান, আগের তুলনায় তাদের খরচ বেড়েছে। কিন্তু গ্রাহকের সংখ্যা কমেছে।
গ্লোবাল ওয়েলনেস ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডে এই স্বাস্থ্য- উন্নয়নভিত্তিক পর্যটন শিল্প টিকে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে এই শিল্প থেকে দেশটি ১২০ কোটি ডলার আয় করেছে যা ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার সম্মিলিত আয়ের চেয়েও বেশি। মিয়ামিভিত্তিক সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, এ খাতে ৫ লাখ ৩০ হাজার থাই কর্মী সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। যা দেশটির মোট কর্মীর ১ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া এই খাত থেকে দেশটির মোট প্রবৃদ্ধির ২ দশমিক ৬ শতাংশ আয় হয়।
ম্যাসেজ, স্পা থেরাপি এবং বিভিন্ন ধরনের থেরাপি স্বাস্থ্য- উন্নয়নভিত্তিক পর্যটন শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। থাইল্যান্ডের ২ হাজার ৮০০ বিলাসবহুল স্পা থেকে বছরে আয় হয় ১৩০ কোটি ডলার। এছাড়াও দেশটিতে আরও ১০ হাজার ম্যাসাজ আউটলেট রয়েছে।
ব্যাংক অফ আয়ুধ্যা পিসিএল-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ সোমপ্রভিন ম্যানপ্র্যাসেট বলেন, ম্যাসাজ বেশ কষ্টসাধ্য একটি কাজ। ম্যাসাজকর্মীর যে দক্ষতা তা অন্য কাজে লাগানো বেশ কঠিন। তিনি আরও বলেন, দেশজুড়ে প্রচুর ম্যাসাজ পার্লার থাকায় এমনিতেই এই শিল্পে বেশ প্রতিয়োগিতা ছিল। এখনকার পরিস্থিতে অনেকের পক্ষে টিকে থাকা চ্যালেঞ্জের হবে।
থাই সরকার ১৯৯০ এর দশকের শেষদিকে এশীয় আর্থিক সংকটের সময় কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বেকারদেরক বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে ম্যাসাজ সেন্টারের দিকে ঝুঁকেছিলেন। এর এক দশক পর অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ম্যাসাজ খাত বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
লকডাউনের পর গতমাসে থাইল্যান্ডে স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্বে মেনে ম্যাসাজ পর্লারগুলি খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়ার স্থানীয়দের সতর্কতার পরও ১ জুলাই থেকে সীমান্তও খুলে দেয়া হয়েছে বেশ কিছু দেশের জন্য। এরপরও সংকট কাটছে না এ শিল্পের।
ব্যাংককের ফিকুল ম্যাসেজ এবং স্পা সেন্টার পরিচালনা করছেন এমন এক মালিক নট্টাভিপা সাঙ্গাকি বলেন, বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পরে আমাদের বেশিরভাগ ম্যাসাজকর্মী তাদের নিজ শহরে ফিরে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সব কর্মীদের ফিরে আসতে বলা হয়েছে, তবে গ্রাহক কম থাকায় কেউ কেউ তাদের খামারে থাকতে চাইছেন । অনেকে আবার অন্য চাকরির চেষ্টা করছেন।
থাইল্যান্ডের ম্যাসেজ পার্লারের বেশিরভাগই রাস্তার পাশের সাধারণ দোকানের মতো। সেখানে প্রতি ঘণ্টায় ৩ ডলার থেকে ১০ পর্যন্ত বিল নেয়া হয়। এই টাকা স্টোর মালিক ও ম্যাসাজকর্মী ভাগাভাগি করে নেন। সম্প্রতি এই ধরনের পার্লারের ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি কর্মী বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন।
যদিও ম্যাসাজ সেন্টারগুলো আবারও খোলার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে কিন্তু কর্মীদের সঙ্গে কমপক্ষে দেড় মিটার দুরত্ব বজায় রাখা,স্বাস্থ্যবিধি সুরক্ষার শঙ্কায় পর্যটকরা আগের মতো এখানে আসতে আগ্রহী হবেন না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বেইজিংয়ের এক মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ গাও জে হুই বলেছেন, ম্যাসাজ স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। তবে এখন আমাদের এ বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। সূত্র : ব্লুমবার্গ
- বিষয় :
- থাইল্যান্ড
- থাই ম্যাসাজ সেন্টার