সমকাল এক্সপ্লেইনার
‘ওয়ান্টেড’ মাদুরোর দেশে সিআইএ’র অভিযান, কী চায় যুক্তরাষ্ট্র
ভেনেজুয়েলায় সিআইএ’র অভিযানের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইলাস্ট্রেশন: সমকাল
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:০৭ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:০৩
ভেনেজুয়েলায় তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন নিকোলাস মাদুরো। তেল, স্বর্ণ ও খনিজ সমৃদ্ধ দেশটির এই রাষ্ট্রপ্রধানের নাম আছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায়ও।
গত আগস্টে মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটে এই বিজ্ঞপ্তি এখনো (১৬ অক্টোবর) আছে। যেটি জারি করা হয়েছে মাদক পাচারের অভিযোগে। এবার একই কারণে ভেনেজুয়েলায় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) অভিযানের অনুমতি দিলো যুক্তরাষ্ট্র।
গতকাল বুধবার এই অনুমতি দেওয়ার কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেন, ‘সিআইয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে স্থল অভিযান চালানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।’ মার্কিন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, অভিযানটির লক্ষ্য নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে উৎখাত করা।
প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র কেন সরকার উৎখাত করতে চায়? মাদুরো প্রশাসন কী বলছে, আগ্রাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে কী আছে? সম্প্রতি শান্তিতে নোবেল পাওয়া মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মার্কিন ঘনিষ্ঠতাকে কীভাবে দেখা হচ্ছে?
সিআইয়ের অভিযানের লক্ষ্য
বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে সিআইএর অভিযানের কারণ উল্লেখ করেন ট্রাম্প। আর সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে অভিযানের লক্ষ্যের বর্ণনা দিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
মূলত, নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বুধবার সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন। যেটির জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রথমত, তারা (ভেনেজুয়েলা) তাদের কারাগারগুলো খালি করে অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশটি থেকে সমুদ্র পথে প্রচুর পরিমাণে মাদক ঢুকছে।
মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে হটানোর উদ্দেশ্য সরাসরি উল্লেখ না করলেও ট্রাম্প বলেন, তাঁর মনে হচ্ছে ভেনেজুয়েলার নেতারা এখন চাপে আছেন। তারা এখন উত্তাপ অনুভব করছে। আরও অনেক দেশও একইভাবে চাপের মুখে আছে।
_1760619707.jpg)
ট্রাম্প সরাসরি না বললেও কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তাদের বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, সিআইএকে অভিযানের অনুমতি দেওয়াটা নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ পদক্ষেপ। এই অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাটি মারণাস্ত্র নিয়ে দেশটিতে অভিযান চালাবে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালনার ক্ষমতাও থাকবে। এই সংস্থা একতরফা বা বড় কোনো সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে নিকোলাস মাদুরো বা তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি, সিআইএ ভেনেজুয়েলায় কোনও নির্দিষ্ট অভিযান পরিকল্পনা করছে কিনা। এর কর্মকর্তাদের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া
বুধবার ভেনেজুয়েলার জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও শান্তি পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নিকোলাস মাদুরো। সেখানে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিআইয়ের অভিযানের সমালোচনা করেন। ১৯৭৬-৮৩ সালে আর্জেন্টিনায় সিআইয়ের গোপন অভিযানে ৩০ হাজার মানুষের নিখোঁজ হওয়াসহ চিলিতে ১৯৭৩ সালের ক্যু-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
মাদুরো বলেন, আমরা এমন কোনও উপায়ে শাসন পরিবর্তন চাই না যা আমাদের আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ার পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেবে। সিআইএ এমন উৎখাত অভিযান আর কতদিন চালাবে? লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রয়োজন নেই।
মাদুরো তাঁর ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য টানেননি। তবে একইদিন ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ট্রাম্পের এমন বক্তব্য যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়। অন্য একটি দেশে ট্রাম্পের অভিযান চালানোর অনুমতি দেওয়াটা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের গুরুতর লঙ্ঘন।
যা আছে আন্তর্জাতিক আইনে
জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২ (৪) অনুযায়ী, অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ বা হুমকি নিষিদ্ধ। অনুচ্ছেদ ৫১-তে আছে আত্মরক্ষার অধিকারের কথা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সংবিধির অনুচ্ছেদ ৮(বি) অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক, স্থাপনায় হামলা করাটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের প্রতিবেদনে ‘টার্গেট কিলিং’কে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশ আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়।
কেন মাদুরোকে ‘হটানোর চেষ্টা’
সম্প্রতি ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালায় মার্কিন নৌবাহিনী। দাবি করা হয়, এসব নৌযানে মাদক পাচার করা হচ্ছিল। কিছুদিন আগে সেনাবাহিনীকে ভেনেজুয়েলায় হামলার প্রস্তুতি নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এনপিআরের তথ্য, গত মাসের শুরুর দিকে ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন বাহিনী অন্তত পাঁচটি নৌযান ধ্বংস করে। চারটি ভেনেজুয়েলা থেকে যাত্রা করেছিল। হামলায় ২৭ জন নিহত হন।
_1760619770.jpg)
যুক্তরাষ্ট্রের মাদুরো বিরোধীতা প্রসঙ্গে যেসব বিষয় সামনে আসছে সেগুলোর মধ্যে একটি এই মাদক চোরাচালান। মার্কিন কর্তৃপক্ষের কেউ মাদুরোকে সরানোর বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। তবে বারবার তাঁকে মাদক ব্যবসার হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্ট যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, সেখানেও মাদুরোর পরিচয় দেওয়া হয়েছে মাদক পাচারকারী হিসেবে। বলা হয়েছে, ‘অবৈধ মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমেরিকানদের নিরাপদ রাখা হবে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিকবার মাদুরোকে মাদক চোরাচালানের নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর মাদুরো বলছেন, মূলত তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা হিসেবেই এমন অপবাদ দেওয়া হচ্ছে।
মাদুরোর শাসন ও মাচাদোর নোবেল
মাদুরোর রাজনৈতিক দলের নাম ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা (ইউএসপিভি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ। ক্ষমতায় থাকাকালে বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের অভিযোগ তোলেন চাভেজ। ২০১৩ সালের মার্চে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন। পরে ইউএসপিভির হয়ে নির্বাচন করে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আছেন চাভেজের শিষ্য নিকোলাস মাদুরো। চাভেজের মতো তিনিও ‘মার্কিন আগ্রাসন’ বিরোধী।
_1760619897.jpg)
গত বছরের নির্বাচনে মাদুরোর বিপরীতে প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে চেয়েছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তবে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়। মাদুরোপন্থীদের অভিযোগ, মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে সরকার হটানোর আন্দোলন করছেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও গুঞ্জন আছে, মাচাদো যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন।
নিউজ উইকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাচাদো নোবেল পাওয়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সমর্থকরা এই পুরস্কারকে ভেনেজুয়েলায় বিরোধী দলের লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। তবে কেউ কেউ এটিকে দেখছেন; ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর এক প্রকার পরোক্ষ অনুমোদন হিসেবে। যা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটে বাইরের হস্তক্ষেপ ও গণতান্ত্রিক ফলাফল গঠনে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
