ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

রাশিয়ার ‘কান্ট্রি কিলার’ পসাইডন যেভাবে বিশ্ব নিরাপত্তা বদলে দিচ্ছে

পসাইডন নামে পারমাণবিক শক্তি চালিত ড্রোন সম্পর্কে রাশিয়া দাবি করেছে, এটি ‘গেম চেঞ্জিং কান্ট্রি কিলার’। যা প্রতিপক্ষের উপকূলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।

রাশিয়ার ‘কান্ট্রি কিলার’ পসাইডন যেভাবে বিশ্ব নিরাপত্তা বদলে দিচ্ছে
×

পারমাণবিক শক্তি চালিত ‘পসাইডন’ নামের ড্রোন নিয়ে সম্প্রতি তথ্য দেন ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত/ ইলাস্ট্রেশন: সমকাল

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৩৩ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১৭:৫২

রাশিয়া সম্প্রতি পসাইডন নামে পারমাণবিক শক্তি চালিত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। যেটি সমুদ্রের তলদেশে চলতে সক্ষম। উপকূলের কাছে বিস্ফোরিত হলে সুনামি সৃষ্টি হবে, ধ্বংস হয়ে যাবে যে কোনো বড় শহর।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমিরি পুতিন নিজেই বলেছেন, ‘পারমাণবিক শক্তি চালিত ড্রোনটি এতটাই দ্রুত চলাচল করে যে এটি শনাক্ত বা বাধা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।’ রাশিয়ার এমন ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে টক্কর দিতে এর বিকল্প নেই। 

পসাইডন সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপনের সময় রুশ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এটি ‘গেম চেঞ্জিং কান্ট্রি কিলার’। যা প্রতিপক্ষের উপকূলে ব্যাপক আকারে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম। প্রশ্ন হলো- রাশিয়ার এখন প্রযুক্তির সক্ষমতা আসলেই কতটুকু? সফলতার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষকরা কী বলছেন? এটি কি কেবলই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি কোনো সংকেত? বিশ্ব কি আবারও পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে? কোন দেশের কাছে কী পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র আছে?

পসাইডন ও এর সক্ষমতা
গ্রীক পুরাণে পসাইডন বলতে সমুদ্রের দেবতাকে বোঝায়। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই রাশিয়া তাদের অত্যাধুনিক ড্রোনটির নামকরণ করেছে। এটি ক্রেমলিনের ছয়টি পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্পের একটি। এগুলোকে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন ‘সুপার ওয়েপন’ হিসেবে। পসাইডন পানির নিচে ঘণ্টায় প্রায় ১১৫ মাইল বেগে ছুটতে সক্ষম। প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও এড়াতে পারবে। 

মডার্ন ডিপ্লোমেসির তথ্য অনুযায়ী, একটি পসাইডনের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ২০ মিটার। যা এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবচেয়ে বড় টর্পেডোগুলোর মধ্যে একটি। টর্পেডো হলো একটি স্ব-চালিত বিস্ফোরক অস্ত্র যা পানির নিচে ডুবো জাহাজের মতো চলতে পারে। এই টর্পেডো একটি ছোট পারমাণবিক রিয়েকটর দ্বারা চালিত। এটি নির্দেশনা অনুসরণ করে লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়। 

এর মূল অংশে একটি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র আছে, যেটির বিস্ফোরণ ক্ষমতা আনুমানিক ২ মেগাটন বা এর বেশি। হিরোশিমায় নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমার শক্তি ছিল প্রায় শূন্য দশমিক ০১৫ মেগাটন। 

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাস-এর তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রু শহরের উপকূলে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি বিশাল তেজস্ক্রিয় সুনামি তৈরি করা। ফলে এলাকাটি কয়েক দশকের জন্য বসবাস অনুপোযোগী হয়ে যাবে। এর লক্ষ্য হলো নিউইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করা।

মডার্ন ডিপ্লোমেসি বলছে, আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থায় শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পসাইডন গভীর সমুদ্রে উচ্চগতিতে চলাচল করায় এটিকে প্রতিহতের বাস্তবসম্মত উপায় এখনো উদ্ভাবন হয়নি। অর্থাৎ, শত্রুর আঘাতে রাশিয়া যদি প্রথমে বিধ্বস্ত হয় তবুও সাগরে আগে থেকেই নির্দেশনা দিয়ে রাখা পসাইডনের মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে পারবে। 

সফলতার সম্ভাবনা কতটুকু
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক শক্তি চালিত এই ড্রোনের নকশা নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন প্রথম কথা বলেন ২০১৮ সালে। সে সময় একটি নমুনা ভিডিও তুলে ধরা হয়। যেখানে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রটির লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা। তখন এটিকে ‘কান্ট্রি কিলার’ হিসেবেও উপস্থাপন করেন কেউ কেউ। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার ফোর্ড পসাইডন সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি মার্কিন উপকূলীয় শহরগুলোকে তেজস্ক্রিয় সুনামির মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হচ্ছে। 

উপকূলে আঘাত হানার জন্য রাশিয়া যে এবারই প্রথম উদ্যোগ নিলো বিষয়টা এমন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়ও সুনামির মতো তেজস্ক্রিয় তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করা হয়েছিল। দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা বিশেষজ্ঞ পাভেল পোডভিগ বলছেন, তখন এ নিয়ে একাধিকবার গবেষণা করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই ফলাফলে বলা হয়, এটি কাজে আসবে না। একটি গবেষণায় তখন এটিকে অবাস্তব ধারণা বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল।

অলাভজনক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালিসিসি। এর রাশিয়া মিলিটারি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রধান গবেষক মাইকেল বি পিটারসেন ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, পসাইডন সম্পর্কে কিছু বিষয় এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। অস্ত্রটিতে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য পূর্বনির্ধারিত কি না, নেভিগেশনের জন্য স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন ব্যবহার করে কি না- তা স্পষ্ট নয়। লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য এটি হয়তো স্থলভাগে থাকা কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে পসাইডন ঘিরে সুনামি সৃষ্টির দাবি ও জনসাধারণের আলোচনা আপাতত কিছুটা নাটকীয় মনে হচ্ছে।

কেবলই উদ্ভাবন নাকি সংকেত
গত আগস্টে সামাজিক মাধ্যমে রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাদানুবাদ হয়। সেটি ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ ও শুল্ক নিয়ে। এর জেরে রাশিয়াকে লক্ষ্য করে দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

এর প্রায় আড়াই মাস পর রাশিয়া পসাইডন নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুললো। অন্যভাবে দেখলে ঘোষণাটি এসেছে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিনের এক বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ওই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। 

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, পুতিন প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর কথা বলার পর এর সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি রাশিয়াকে অস্ত্রের পরীক্ষা না চালিয়ে শান্তি আলোচনায় মনোযোগ দিতে বলেন। 

প্রশ্ন উঠছে, গত আগস্টে আলাস্কায় দুই নেতার বৈঠকের পর এমন কী হলো যে; উভয় দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে? রাশিয়ার কমারসান্ত নামের পত্রিকায় রাজনীতি বিশ্লেষক দিমিত্রি ট্রেনিন লিখেছেন, ক্রেমলিন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যুদ্ধ নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার তথাকথিত বিশেষ কূটনৈতিক অভিযানও কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

আবারও কি পারমাণবিক পরীক্ষার যুগ শুরু
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার প্রতিযোগিতা আবার ফিরে আসছে কি না? এর উত্তরে কানাডার সিবিসি নিউজ বলছে, হ্যাঁ। তবে সেটি আংশিকভাবে। কারণ এখন পর্যন্ত রাশিয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কোন ধরনের পরীক্ষা চালাবে তা শুরুতে অস্পষ্ট ছিল। তবে গত রোববার (২ নভেম্বর) মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হবে না। এই পরীক্ষাগুলোয় মূলত পারমাণবিক অস্ত্রের অন্য অংশগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা যাচাই করা হবে।

ফক্স নিউজের অনুষ্ঠান ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’-এ ক্রিস রাইট বলেন, ‘আমরা যেসব পরীক্ষার কথা বলছি, সেগুলো সিস্টেম টেস্ট। এগুলো পারমাণবিক বিস্ফোরণ নয়। এগুলোকে আমরা বলি নন-ক্রিটিক্যাল এক্সপ্লোশন বা অগুরুত্বপূর্ণ বিস্ফোরণ।’

বেশি পারমাণবিক অস্ত্র কোন দেশের
বর্তমানে নয়টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। দেশগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইসরায়েল। এসব দেশের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতায় এগিয়ে আছে রাশিয়া।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরপি) -এর জানুয়ারি মাসের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার মোট যুদ্ধমুখী ওয়ারহেডের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি- ৪ হাজার ৩০৯টি। এরপর আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কাছে আছে ৩ হাজার ৭০০টি ওয়ারহেড। চীনের ৬০০; ফ্রান্সের ২৯০; যুক্তরাজ্যের ২২৫; ভারতের ১৮০; পাকিস্তানের ১৭০; ইসরায়েলের ৯০ এবং উত্তর কোরিয়ার আছে প্রায় ৫০টি ওয়ারহেড। অস্ত্রের যে অংশে পরমাণু স্থাপন করা হয় সেটিকে ওয়ারহেড বলে।

এসআইপিআরপি-এর জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডার অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর প্রায় ১০০টি করে ওয়ারহেড যুক্ত হচ্ছে। পেন্টাগনের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়, চীন ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজারটির মতো পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হবে।

আরও পড়ুন

×