ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ডনের বিশ্লেষণ

সংবিধানে সামরিক ক্ষমতা জায়গা পেলে বিপর্যয়ের পথ তৈরি হবে

সংবিধানে সামরিক ক্ষমতা জায়গা পেলে বিপর্যয়ের পথ তৈরি হবে
×

পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির কুচকাওয়াজে ভাষণ দেন ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনির। গত ২৯ এপ্রিল। ছবি: ডনের সৌজন্যে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ২০:২৯ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ২০:৪৪

পাকিস্তানে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে দেশটির সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদ নতুন করে সাজিয়ে সামরিক কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। 

সংস্কারটির প্রয়োগিক অর্থ হলো- সেনাপ্রধান সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ অবস্থানে উন্নীত হবেন। যেখানে তিনি সব বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান) ওপর সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবেন। আরেকটু খুলে বললে, এই সংশোধনী ‘তিন বাহিনী-এক প্রধান’ নীতির সাংবিধানিক রূপ দিতে যাচ্ছে। যা পাকিস্তানে ক্ষমতার ভারসাম্যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে নেওয়া বিতর্কিত সংস্কার উদ্যোগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এটি। কারণ, এটি ভিন্ন ভিন্ন সামরিক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও প্রভাব কাঠামোর মধ্যে দ্বন্দ্ব উসকে দেবে। এ ছাড়া, নাড়িয়ে দেবে বেসামরিক ও সামরিকের মধ্যে ক্ষমতার নাজুক ভারসাম্যকেও। 

সংশোধনীর বিলে খুব সহজ করে বলা হয়েছে যে, প্রতিরক্ষা সমন্বয় আধুনিকীকরণ করা হবে। ‘চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি (সিজেসিএসসি)’ পদ বাতিল হবে, নতুন পদের নাম হবে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ)’। কিন্তু এর খসড়া যারা করেছেন, তারা হয়তো বুঝতেই পারেননি এর বাস্তবায়ন কতটা কঠিন হতে পারে। 

পাকিস্তানে চার দশকের বেশি সময় ধরে সিজেসিএসসি ছিলেন তিনটি সামরিক বাহিনীর প্রতীকী প্রধান। এই পদ তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবে এই পদটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক। কারণ, সেনাবাহিনী অন্য দুই বাহিনীর কাউকে এই পদে বসতে দিতো না। 

প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, আগামী ২৭ নভেম্বর সিজেসিএসসি পদটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হবে। একই দিন সিডিএফ করা হবে সেনাপ্রধানকে। তখন তিনটি বাহিনীই তার অধীনে যাবে।

মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা গবেষক শিরিন মাজারি বিলটির একটি অমীমাংসিত বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সিজেসিএসসি পদের সঙ্গে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটিও কি বিলুপ্ত হবে? যদি হয়, তাহলে তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কোন ফোরাম কাজ করবে তা স্পষ্ট নয়। 

বিলের সমর্থকরা বলছেন, এই পরিবর্তন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ এবং একক কমান্ডের কার্যকারিতা বাড়াবে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এটি এক ধরনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক দখল’। সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিফ ইয়াসিন মালিক সতর্ক করে বলছেন, সেনা কর্মকর্তাকে সিডিএফ পদে বসিয়ে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওপরও কর্তৃত্ব আরোপের ক্ষমতা দিলে তা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য নষ্ট করে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের পথ তৈরি করবে।

 

ইয়াসিন মালিক আরও বলেন, এই সংশোধনী প্রতিরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট একজনকে সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

 

সামরিক সংস্কৃতি অনুযায়ী, তিন বাহিনীর অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন। নৌ ও বিমান বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মনে করে, তারা স্থলে থাকা বাহিনীর (সেনা) অধীনে গেলে স্বাধীনতা হারাবে। বিভিন্ন সময় এমন চেষ্টার প্রতিবাদও জানিয়েছে। 

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নতুন ব্যবস্থায় বিমান ও নৌবাহিনীতে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শিরিন মাজারি সতর্ক করে বলছেন, যদি বিমান ও নৌবাহিনীর পদোন্নতি সিডিএফ পদে থাকা সেনা কর্মকর্তার দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। এটি সদস্যদের মনোবলেও প্রভাব ফেলবে।

শিরিন মাজারি আরেকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন। বিমানবাহিনীতে মার্শাল ও নৌবাহিনীতে অ্যাডমিরাল থাকেন। চিফ অব এয়ার স্টাফ (সিওএএস) হন চার তারকা জেনারেল। তারা কি সিডিএফ-এর অধীনে থাকতে রাজি হবেন?

ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের কমান্ডারের পদ সংক্রান্ত প্রস্তাবটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই পদের দায়িত্বরত ব্যক্তি পারমাণবিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ দেখভাল করবেন। সংশোধনী আনা হলে, সেনাপ্রধানের সুপারিশে কমান্ডার বাছাই করবেন প্রধানমন্ত্রী। শিরিন মাজারি বলছেন, অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, সব পারমাণবিক অস্ত্র এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে সেনাবাহিনীর হাতে। এতে যুদ্ধ পরিস্থিতির সময় নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সম্ভবত সবচেয়ে বিতর্কিত ধারাটি হলো, পাঁচ-তারকা পদে উন্নীত অফিসারদের (ফিল্ড মার্শাল, এয়ার ফোর্সেস মার্শাল ও অ্যাডমিরাল) আজীবন সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা। এই অফিসারদের পদ ও সুবিধা জীবনভর বজায় রাখা হবে। কেবল অনুচ্ছেদ ৪৭ অনুযায়ী, অভিশংসনের মাধ্যমে তাদের সরানো যাবে। অনুচ্ছেদ ২৪৮ অনুযায়ী তারা রাষ্ট্রপতির মতো সুরক্ষাও পাবেন। মূলত, গত মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর জেনারেল আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল করার বৈধতা দিতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

এ ধরনের বিধান সম্মান ও ক্ষমতার সীমানা অস্পষ্ট করে দেয়। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াসিন মালিক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রেও জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান সম্পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করেন না। সেনা কর্মকর্তাদের জন্য জীবনভর সুরক্ষার ব্যবস্থা করাটা নাগরিক শাসনের মূল ধারণার একেবারে বিপরীত।

এ সংশোধনের সমর্থকদের মধ্যে মন্ত্রীরাও আছেন। তাদের দাবি, এটি কেবল বিদ্যমান প্রথার আনুষ্ঠানিকীকরণ। কিন্তু সামরিক বাহিনীতে সমন্বয়ের বদলে কেন্দ্রীয়করণের দিকটি মূলত পাকিস্তানের সামরিক রাজনীতির টানাপোড়েনকেই প্রতিফলিত করছে। অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে সিডিএফ পদ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই পদকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা পরে সহজেই পরিবর্তন করা যায় না। 

পাকিস্তানে অবশ্যই আধুনিক প্রতিরক্ষা কাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই আধুনিকীকরণ কি প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য বিনাশের বিনিময়ে করা হচ্ছে? ইতিহাস সতর্ক করছে যে, সামরিক ক্ষমতা একবার সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলে তা কখনোই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না।

অনুচ্ছেদ ২৪৩ অনুযায়ী, এতদিন সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত ছিল। ২৭তম সংশোধনীটি এখন সেনা কর্তৃত্বের চুক্তি হিসেবে পুনঃলিখনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

লেখক: বাকির সাজ্জাদ সাইয়েদ। পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনে লেখাটি প্রকাশ হয়েছে রোববার।

আরও পড়ুন

×