এক্সপ্লেইনার
পাকিস্তানে সংবিধান সংশোধন ও সেনাপ্রধানের ক্ষমতা নিয়ে কেন বিতর্ক
পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির কুচকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (ডানে) ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ফাইল ছবি: এএফপি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | ১৫:৩১ | আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | ২০:২৭
পাকিস্তানের সিনেটে দেশটির সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী নিয়ে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবে বিচারিক কাঠামো ও সামরিক কমান্ড ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত আছে। সোমবার বিলটির ওপর প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন সিনেটের আইন ও বিচারবিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান।
দেশটির গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই সংশোধনীর লক্ষ্য হলো শাসন কাঠামোর আধুনিকীকরণ। প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা এবং ২০০৬ সালের ‘চার্টার অব ডেমোক্রেসি’-এর আওতায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা।
প্রস্তাবিত কয়েকটি সংশোধনীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ২৪৩ অনুচ্ছেদ নিয়ে। এটির আওতায় এতদিন সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু সংশোধনের পর সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকবেন সেনাপ্রধান। তিনি সব বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান) ওপর সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবেন। বলা হচ্ছে, এটি পাকিস্তানে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে ক্ষমতার ভারসাম্যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
_1762766520.jpg)
প্রশ্ন হলো- পাকিস্তানের সংবিধানে কেন এমন সংশোধন করতে চাওয়া হচ্ছে? বাকি প্রস্তাবগুলো কী, বিল পাসের সম্ভাবনা কতটুকু, বিরোধী দলের নেতারা কী বলছেন?
মূল প্রস্তাবগুলো কী
১. ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত গঠন: ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীর আওতায় একটি নতুন ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত গঠন করা হবে। এটি সংবিধানসংক্রান্ত মামলাগুলো দেখভাল করবে। সুপ্রিম কোর্টের কিছু ক্ষমতাও নতুন আদালতে হস্তান্তর করা হবে।
খসড়া অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বিচারপতি নিয়োগে মূখ্য ভূমিকা পালন করবেন। বিচারপতিদের সংখ্যা পার্লামেন্ট নির্ধারণ করবে। ফেডারেল সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতির মেয়াদ হবে ৩ বছর। নতুন এই আদালতে সব প্রদেশের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে।
২. প্রতিরক্ষা কাঠামো পুনর্গঠন: জিও নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশোধনী বিলে সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদ পুনর্গঠনের প্রস্তাব করা হয়ছে। যেটির মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড কাঠামোও নির্ধারণ করা হবে।
এই অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে যেসব পরিবর্তন আনা হবে সেগুলোর মধ্যে আছে- চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি (সিজেসিএসসি) এর পদ বিলুপ্ত করে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) পদ সৃষ্টি করা হবে।
চিফ অব আর্মি স্টাফ আগামী ২৭ নভেম্বর সিডিএফ পদে বসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর সুপারিশে প্রধানমন্ত্রী ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড- এর কমান্ডার নিয়োগ করবেন। এই পদে দায়িত্বরত ব্যক্তি পারমাণবিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ দেখভাল করেন।
_1762766684.jpg)
ফিল্ড মার্শাল, মার্শাল অব দ্য এয়ার ফোর্স এবং অ্যাডমিরাল অব দ্য ফ্লিট- এর মতো সম্মানসূচক সামরিক পদগুলো আজীবন মর্যাদা বহন করবে। তবে পার্লামেন্ট প্রয়োজন হলে এই উপাধিগুলো বাতিলের ক্ষমতা রাখবে।
৩. প্রাদেশিক সাংবিধানিক আদালত ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পুনর্বহাল: পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো এক্স (আগের টুইটার)- এ পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো প্রশাসনিক তদারকি জোরদার এবং বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি করা। প্রাদেশিক সাংবিধানিক আদালত গঠন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য সরকার তাঁর দলের সমর্থন চেয়েছে।
৪. এনএফসি পুরস্কারের অধীনে আর্থিক সমন্বয়: সংশোধনীতে ন্যাশনাল ফাইন্যান্স কমিশন (এনএফসি) অ্যাওয়ার্ডের অধীনে প্রাদেশিক অংশীদারত্বের সাংবিধানিক সুরক্ষা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপটি একটি সুষম আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে সমন্বয় মজবুত করতে সহায়ক হবে।
৫. রাষ্ট্রপতির আজীবন দায়মুক্তি: পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে ফৌজদারি অপরাধ থেকে আজীবন দায়মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কেন ২৪৩ অনুচ্ছেদ সংস্কার
ডনের তথ্য, পাকিস্তানে চার দশকের বেশি সময় ধরে সিজেসিএসসি ছিলেন তিনটি সামরিক বাহিনীর প্রতীকী প্রধান। এই পদ তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবে এটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক। কারণ, সেনাবাহিনী অন্য দুই বাহিনীর কাউকে এই পদে বসতে দিতো না।
বিলের সমর্থকরা বলছেন, এই পরিবর্তন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ এবং একক কমান্ডের কার্যকারিতা বাড়াবে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এটি এক ধরনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক দখল’।
মূলত, গত মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর জেনারেল আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল করার বৈধতা দিতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সংশোধনের সমর্থকদের মধ্যে মন্ত্রীরাও আছেন। তাদের দাবি, এটি কেবল বিদ্যমান প্রথার আনুষ্ঠানিকীকরণ।
_1762766854.jpg)
ডনের নিবন্ধে বলা হয়েছে, অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে সিডিএফ পদ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই পদকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা পরে সহজেই পরিবর্তন করা যায় না।
কত ভোট প্রয়োজন?
সংবিধান সংশোধনের জন্য পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেটের ৯৬ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৬৪ জনের সমর্থন লাগবে। কিন্তু সিনেটে ক্ষমতাসীন জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাদের সিনেটর আছে ৬১ জন। তাই বিল পাস করতে হলে বিরোধী পক্ষের আরও তিনজন সিনেটরের সমর্থন দরকার।
সিনেটে অনুমোদন পেলে, বিলটি স্থানীয় সময় সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ভোটের জন্য তোলার কথা। নিম্নকক্ষে অবশ্য ক্ষমতাসীন জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। এখানে জোটের ২৩৩ ও বিরোধী দলের সদস্য ১০৩ জন।
বিরোধীরা কী বলছেন
পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দলের জোট- টিটিএপি। জোটের সঙ্গীদের মধ্যে আছে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোকে জোটের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তারা সতর্ক করেছে, এই পরিবর্তনগুলো পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দেবে।
টিটিএপি বা তেহরীক তাহাফুজ আইয়েন-এ-পাকিস্তান ২৭তম সংশোধনীকে ‘সংবিধানের ওপর আক্রমণ’ হিসেবে দেখছে। জোটের নেতারা এটিকে ‘পাকিস্তানের নাইন-ইলেভেন’ বলেও তুলনা করেছেন। রাষ্ট্রের ভিত্তির ওপর আক্রমণের অভিযোগ তুলে তারা সারাদেশে প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
