ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় হামলা ও মাদুরো অপহরণ 

যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনে কতটুকু বৈধ

মার্কিন সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন– বলছেন বিশেষজ্ঞরা

যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনে কতটুকু বৈধ
×

ছবি-সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০০:৩৭

ভেনেজুয়েলায় গত শনিবার সকালে মার্কিন বাহিনী যেভাবে হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে নিয়ে গেছে, তা আন্তর্জাতিক আইনে কতটুকু বৈধ, এ নিয়ে চলছে বিতর্ক। প্রায় সব বিশেষজ্ঞই একমত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সনদের শর্তাবলির সরাসরি লঙ্ঘন। কিন্তু এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা বা তা আদৌ সম্ভব কিনা– সে প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। এরই মধ্যে রাশিয়া, ইরান, চীনসহ বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের কড়া নিন্দা জানিয়েছে। গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মহাসচিবের মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, এসব হামলার ঘটনা বিশ্বে বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করতে পারে। 

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন পদক্ষেপ নিয়ে গতকাল রোববার ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক জেরাল্ডিন ম্যাককেলভির লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ওয়াশিংটন তাদের এই পদক্ষেপকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবেই দাবি করবে এবং এর বিপরীতে তাদের বড় কোনো গুরুতর বাধার সম্মুখীন হতে হবে না। অথচ এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি ট্রাম্পের কিছু মিত্রও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। 

ভেনেজুয়েলায় চলমান এই ঘটনাবলির বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত জানতে দ্য গার্ডিয়ান তাদের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা বলছেন, ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত জাতিসংঘ সনদের মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বড় কোনো সংঘাত রোধ করা। এই চুক্তির একটি কেন্দ্রীয় বিধানে আছে, সব দেশকে অবশ্যই অন্য দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং তাদের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে। ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান এবং সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের যুদ্ধাপরাধ আদালতের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিওফ্রে রবার্টসন কেসি বলেন, ভেনেজুয়েলায় এই হামলা জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। এ ধরনের আগ্রাসনকেই জার্মানির নুরেমবার্গ আদালত ‘সর্বোচ্চ অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

কিংস্টন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক এলভিরা ডোমিঙ্গুয়েজ-রেডন্ডোও এই অভিযানকে আগ্রাসন এবং অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে শক্তির বেআইনি ব্যবহার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড লিগ্যাল স্টাডিজের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট রিসার্চ ফেলো এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক সুসান ব্রিউ একমত পোষণ করে বলেন, এই হামলা কেবল তখনই বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারত, যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রস্তাব থাকত অথবা তারা আত্মরক্ষায় কাজ করত। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রের কোনোটিতেই কোনো প্রমাণ নেই।

জিওফ্রে রবার্টসন কেসি বলছেন, জাতিসংঘ সনদ এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইন– উভয়ই আত্মরক্ষার খাতিরে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কিছুটা সুযোগ রাখে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই দাবি করতে পারে না যে, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ আত্মরক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে। 

এই পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে?
শান্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যে কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য– যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নেওয়া যে কোনো পদক্ষেপ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তারপরও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় আক্রমণের জন্য যদি যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়, তবে এটি অন্যান্য দেশকেও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে উৎসাহিত করতে পারে।
 

আরও পড়ুন

×