ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্লেষণ

সম্পদ জাতীয়করণই শাসকদের বিপদ ডেকে এনেছে

সম্পদ জাতীয়করণই শাসকদের বিপদ ডেকে এনেছে
×

কোলাজ

 সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

যখনই কোনো দেশ তার কৌশলগত সম্পদ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, তখনই পরাশক্তিগুলো সেখানে ‘শাসন পরিবর্তন’কে বৈধতা দেওয়ার ভাষা ও কৌশল খুঁজে নেয়। 

১৯৫১ সালের ইরান থেকে চলতি মাসের ভেনেজুয়েলা; মাঝের সময়ের আরও অন্তত ১৩টি দেশে সরাসরি শাসক পরিবর্তন বা চাপ তৈরির কারণ বোঝাতে ওপরের বাক্যটিই সবচেয়ে বেশি জুতসই।

এই ১৩টির মধ্যে অধিকাংশ দেশ তাদের বিরল খনিজ সম্পদের কারণে পরাশক্তির কোপে পড়েছে। কৌশলগত সম্পদের মধ্যে আছে– তেল, কপার, তামা, কোবাল্ট, এমনকি কলাও। আবার ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বও সামরিক হস্তক্ষেপের কারণ হয়েছে।

এসব দেশের শাসকরা যখনই নিজ দেশের সম্পদ জাতীয়করণ করতে চেয়েছেন, তখনই তাদের পতন ঘটানো হয়েছে ভয়াবহভাবে। বেশির ভাগ শাসককে হটানোর ক্ষেত্রে কখনও পেছন থেকে আবার কখনও সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকটিতে ভূমিকা ছিল যুক্তরাজ্য, রাশিয়া এবং বেলজিয়ামেরও।

শাসক হটানোর তিন অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে শাসক পরিবর্তনের ঘটনাগুলোকে তিন পর্বে ভাগ করেছেন আমেরিকান ইতিহাসবিদ ও লেখক স্টিফেন কিনজার। এ নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন ‘ওভার থ্রো: আমেরিকাস সেঞ্চুরি অব রেজিম চেঞ্জ ফ্রম হাওয়াই টু ইরাক’ নামে। এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় প্রকাশক টাইমস বুকস লিখেছে, বইটিতে সেই সব রাজনীতিক, গুপ্তচর, সামরিক কমান্ডার ও ব্যবসায়িক নির্বাহীদের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে; যারা বিদেশে সরকার উৎখাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

শাসক পরিবর্তনের তিন ধাপের প্রথমটি সাম্রাজ্যবাদ পর্ব। যেখানে মার্কিন চাপের মুখে পড়ে কিউবা, পুয়ের্তো রিকো, ফিলিপাইন, নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাস। স্নায়ুযুদ্ধ পর্বে চাপে ফেলা হয় ইরান, গুয়াতেমালা, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও চিলিকে। আর আগ্রাসন পর্বে মার্কিন সেনা হস্তক্ষেপে সরকার উৎখাত হয় গ্রেনাডা, পানামা, আফগানিস্তান ও ইরাকে।

ইরান: মোহাম্মদ মোসাদ্দেক
মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৫১ সালে। তিনি ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কোম্পানিটি বিপুল মুনাফা করলেও ইরানকে দিত মাত্র ১৬ শতাংশ। অনেক সময় এরও কম। ক্ষমতায় এসে তেল শিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার পরই ব্রিটিশ সরকার মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরিকল্পনা শুরু করে।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিপ্লোম্যাটিক স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের অক্টোবরে মোসাদ্দেক ব্রিটেনকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এককভাবে ওই সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়ে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায়। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা করে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন অ্যাচেসন বলেছিলেন, ব্রিটেন ইরানে ‘শাসন অথবা ধ্বংস’ এই নীতি অনুসরণ করছে।

১৯৫২ সালে ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এবার মোসাদ্দেককে উৎখাতের জন্য ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের আহ্বানে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক সাড়া দেয়। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একসঙ্গে মোসাদ্দেককে অপসারণে কাজ করতে সম্মত হয়।

মোসাদ্দেককে হটানোর পরিকল্পনার নাম ছিল ‘অপারেশন আজাক্স’। মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের রাজবংশের শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে দিয়ে মোসাদ্দেককে বরখাস্তের ফরমান জারি করানো। তবে রেজা পাহলভি এমন অজনপ্রিয় ও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। দীর্ঘ বোঝাপড়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ঘুষের কাছে নতি স্বীকারের পর শেষ পর্যন্ত কাজ হয়। আগস্টের শুরুতে ইরানে সিআইএর সহযোগী এজেন্টরা মুসলিম নেতাদের হুমকি দেয়। মোসাদ্দেক ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করছেন– এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়।

১৯৫৩ সালের ১৬ আগস্ট রেজা পাহলভি আনুষ্ঠানিকভাবে মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করেন এবং সিআইএর পছন্দের প্রার্থী জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। এই ফরমানগুলোর ভাষ্য নির্ধারণ করেছিলেন পরিকল্পনার নীলনকশাকারী ও সিআইএ কর্মকর্তা ডোনাল্ড উইলবার। অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সংঘটিত বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থান ঘটায়। মোসাদ্দেককে তিন বছরের জন্য কারাবন্দি করা হয়। ১৯৬৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দি ছিলেন।

ওই অভ্যুত্থান ইরানে শাহ রাজবংশের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পথ প্রশস্ত করেছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের সময় এটিই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনে শক্তিশালী উপলক্ষে পরিণত হয়। 

গুয়াতেমালা: জাকোবো আরবেনজ গুজমান
১৯৫৪ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) গুয়াতেমালায় বামপন্থি সরকারের বিরুদ্ধে একটি গোপন অভিযান শুরু করে। এর নাম ছিল ‘অপারেশন পিবিসাকসেস’। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেনজ গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। গুয়াতেমালা বিপ্লবের অবসান ঘটে এবং কার্লোস কাস্তিয়ো আরমাসের সামরিক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। গুয়াতেমালায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত প্রথম শাসক ছিলেন এই আরমাস। 

গুজমানকে হটানোর পেছনে ছিল ফলের ব্যবসা। বিশেষ করে কলা। তিনি গুয়াতেমালার কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি ভূমি সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ বিশেষ করে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই ফলের ব্যবসার স্বার্থের কারণে যুক্তরাষ্ট্র গুয়াতেমালাকে বিবেচনা করত নিজেদের উঠান হিসেবে। কিন্তু সেখানে কমিউনিজমের বিস্তার বাড়ায় প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার সিআইএকে অভিযান চালানোর অনুমোদন দেন।

সাতটি দেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে কনস্যুলার অফিসার ছিলেন চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডি। ‘অপারেশন পিবিসাকসেস’-এর ২৫ বছরের বেশি সময় পর তিনি অভিযান সম্পর্কে অবহিত একাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেন। পরে এক নিবন্ধে লেখেন, গুজমানকে সরানোর অভিযানে মার্কিন সমর্থিত বাহিনীর সদস্য খুব বেশি ছিল না। সিআইএ তাই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের কৌশল নেয়। গুয়াতেমালার বাসিন্দাদের মাঝে ছড়ানো হয়, সামরিক অভিযানটি খুবই বড় হবে। মার্কিন বিমানবাহিনী কেবল গুয়াতেমালা সিটিতে হামলা চালায়। অপরদিকে গুয়াতেমালার সেনাবাহিনী জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ২৭ জুন গুজমান পদত্যাগ করেন। এল সালভাদরে আলোচনার পর ৭ জুলাই কার্লোস কাস্তিয়ো আরমাস প্রেসিডেন্ট হন।

কঙ্গো: প্যাট্রিস লুমুম্বা
ঔপনিবেশিক শক্তি বেলজিয়ামের কাছে থেকে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৬০ সালের ৩০ জুন। এতে নেতৃত্ব দেন দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা। তিনি গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি এবং বিদেশি শক্তির হাত থেকে কঙ্গোর খনিজ সম্পদ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা আর ঘটেনি।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি লুমুম্বাকে কাটাঙ্গা অঞ্চলে হত্যা করা হয়। এই কাটাঙ্গা অঞ্চলটি কপার ও কোবাল্ট খনিজসমৃদ্ধ। হত্যাকাণ্ডে বহু আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পক্ষ জড়িত ছিল; বিশেষ করে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি বেলজিয়াম।

লুমুম্বা হত্যাকাণ্ড নিয়ে খোদ বেলজিয়ামই তদন্ত করে। ২০০১ সালে দেশটির সংসদীয় তদন্ত কমিটি জানায়, তৎকালীন (১৯৬১) বেলজিয়ান সরকারের প্রতিনিধিরা কৌশলে লুমুম্বাকে কাটাঙ্গা অঞ্চলে যাওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। সেখানেই তিনি খুন হন। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনের উপসংহারে উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বেলজিয়াম ওই ঘটনার নৈতিক দায় বহন করে, তবে আইনগতভাবে নয়।

লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডের ৬৪ বছর উপলক্ষে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। সেখানে বলা হয়, ১৯৬০ সালের ৩০ জুন স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক দিন পর খনিজসমৃদ্ধ কাটাঙ্গা প্রদেশ আলাদা হওয়ার ঘোষণা দেয়। কঙ্গোর ঔপনিবেশিক শক্তি বেলজিয়াম কাটাঙ্গায় সেনাবাহিনী পাঠায়। এর পর কঙ্গো জাতিসংঘের কাছে সহায়তা চায়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী পাঠালেও তাদের কাটাঙ্গায় মোতায়েন করা হয়নি। ফলে লুমুম্বা সহায়তার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বারস্থ হন। এই পদক্ষেপ বেলজিয়াম ও যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাসাভুবু সরকার থেকে লুমুম্বাকে বরখাস্ত করেন। পরে কর্নেল জোসেফ মোবুতুর (স্বৈরশাসক মোবুতু নামে পরিচিত) নেতৃত্বে হওয়া সামরিক অভ্যুত্থান লুমুম্বাকে পুরোপুরি ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। গৃহবন্দি দশা থেকে এক সময় পালাতে সক্ষম হলেও ডিসেম্বর মাসে মোবুতুর বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।

১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি লুমুম্বা ও তাঁর দুই সহযোগী জোসেফ ওকিতো ও মরিস এমপোলোকে বিমানে করে কাটাঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিনই বেলজিয়ামের তত্ত্বাবধানে কাটাঙ্গার একটি ফায়ারিং স্কোয়াড তাদের তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। 

প্রথমে তাদের মরদেহ অগভীর গর্তে ফেলা হলেও পরে সেখান থেকে তুলে টুকরো টুকরো করে এসিডে গলিয়ে ফেলা হয়। শেষ পর্যন্ত লুমুম্বার কেবল একটি দাঁতই অবশিষ্ট থাকে, যা এক বেলজিয়ান পুলিশ কর্মকর্তা নিজের কাছে রেখেছিলেন। ২০২২ সালে সেটি লুমুম্বার স্বজনদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। পরে উন্মোচিত হয় লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএর সম্পৃক্ততা ছিল।

সিআইএর আনক্ল্যাসিফায়েড গোয়েন্দা নিবন্ধ প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইন্টেলিজেন্স (সিএসআই) তাদের এক নিবন্ধেও লুমুম্বা হত্যায় সংস্থাটির জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘সিআইএর সম্পৃক্ততা এবং হত্যার জন্য একাধিক ষড়যন্ত্রও যে ছিল– তা সত্য। তবে কাহিনি এখানেই শেষ নয়। এই ঘটনাপ্রবাহে জাতিসংঘ এবং কঙ্গোর সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি বেলজিয়ামও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।’

চিলি: সালভাদোর আলেন্দে
২০শ শতকের মধ্যভাগে নীতিনির্ধারকদের চিন্তাভাবনার ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল স্নায়ুযুদ্ধ। ১৯৫৯ সালে কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লব যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম গোলার্ধে কমিউনিজমের বিস্তার এবং সোভিয়েত প্রভাবের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তোলে। মার্কিন কর্মকর্তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন সালভাদোর আলেন্দেকে নিয়ে। নিজেকে মার্কসবাদী বলে ঘোষণা করা এই রাজনীতিক চিলির সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্য ছিলেন এবং একাধিকবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

১৯৬৪ সালের নির্বাচনে আলেন্দে ছিলেন অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী। তিনি চিলির বৃহৎ শিল্প– মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন তামা কোম্পানিগুলো জাতীয়করণের অঙ্গীকার করেছিলেন। নির্বাচনে আলেন্দের প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে এবং কমিউনিজমবিরোধী প্রচারে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে, যা কাজেও দেয়, আলেন্দে পরাজিত হন।

তবে ১৯৭০ সালে আলেন্দে আবার নির্বাচনে দাঁড়ান। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। তারা আলেন্দেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করেন। মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআর তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, সিআইএর হিসাব অনুযায়ী, আলেন্দের নির্বাচনী প্রচারে কিউবা থেকে তিন লাখ ৫০ হাজার ডলার সহায়তা যায়। আর রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির বৈদেশিক কার্যক্রমের ইতিহাস নিয়ে লেখা এক বই অনুযায়ী, মস্কো থেকে যায় অন্তত চার লাখ ডলার।

কিসিঞ্জারের আশঙ্কা ছিল, অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সরকার চিলির ক্ষমতায় বসলে তা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ‘স্পয়লিং অপারেশন’-এর নামে কয়েক লাখ ডলার খরচ করে। এর বড় অংশ ব্যয় হয় আলেন্দের ক্ষমতায় বসা ঠেকাতে পরিচালিত প্রচারণায়। আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে জড়িত ছিল, বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ। তারাই আলেন্দের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে অর্থ পৌঁছে দেয়।

নির্বাচনের তিন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আলেন্দে অল্প ব্যবধানে জয়ী হন। কিন্তু চিলির তৎকালীন সংবিধান এমন ছিল যে, ব্যবধান কম থাকলে কংগ্রেস শীর্ষ দুই প্রার্থীর একজনকে চূড়ান্ত করবে। এই সুযোগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, যে কোনোভাবে হোক, আলেন্দের ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে হবে।
এনপিআর লিখেছে, সিআইএ সরাসরি অভ্যুত্থান উস্কে দিতে চিলির সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করা এক শীর্ষ জেনারেলকে হত্যা করা হয়। কিন্তু সিআইএর সব চেষ্টা সেবার ব্যর্থ হয়। আলেন্দে ক্ষমতায় বসেন। দুই বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফের সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এবার সামরিক জেট বিমান থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদে বোমা হামলা চালানো হয়। জাতির উদ্দেশে শেষবারের মতো দৃপ্তকণ্ঠে ভাষণ দেওয়ার পর আলেন্দে আত্মহত্যা করেন।

সম্পদ নেই, তবু হস্তক্ষেপ
প্রাকৃতিক বিরল সম্পদ ছাড়াও বিদেশি শক্তিদের হস্তক্ষেপের উদাহরণ আফগানিস্তান। স্টিফেন কিনজার তাঁর বইয়ে লিখেছেন, উনিশ শতকে আফগানিস্তানকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের জন্য রাশিয়া ও ব্রিটেনের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়; যা ‘গ্রেট গেম’ নামে পরিচিত। এ ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণত তখনই দেখা যায়, যখন কোনো দরিদ্র দেশের কাছে লোভনীয় কোনো সম্পদ থাকে। কিন্তু আফগানিস্তানের তেল নেই, খনিজসম্পদ নেই, উর্বর জমিও খুব কম। তবুও দেশটি বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের মধ্যে পড়ে।

কিনজারের মতে, আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানই পরাশক্তিদের কাছে বিরল সম্পদের মতো আকর্ষণীয় বস্তুতে পরিণত হয়। ভারত, ইরান, মধ্য এশিয়া ও চীনের দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে আসছে।

১৯৭৩ সালে রাজতন্ত্র উৎখাত হওয়ার পর আফগানিস্তানের শাসকরা ক্ষমতায় ছিল ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত। ওই বছর নতুন করে ক্ষমতায় আসে বামপন্থি জোট। কিন্তু অস্থিরতা শুরু হতে বেশিদিন লাগেনি। প্রভাব পড়ে প্রতিবেশী ইরানে ইসলামী বিপ্লবের। ওই বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার কৌশলগত মানচিত্র আমূল বদলে দেয়। 
স্টিফেন কিনজার লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই বিপ্লবকে একটি গুরুতর ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখতে শুরু করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সুযোগ নিয়ে আফগানিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরের তেল ক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করবে।

১৯৭৯ সালের ১৭ মার্চ সোভিয়েত পলিটব্যুরোর এক জরুরি বৈঠকে কেজিবিপ্রধান ইউরি আন্দ্রোপভ কোনো পরিস্থিতিতেই আফগানিস্তানকে হাতছাড়া না করার প্রতিজ্ঞা করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও আফগান সংকটের দিকে নজর রাখছিল। সোভিয়েতবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে সিআইএ বিদ্রোহীদের সহায়তা দেওয়া শুরু করে। কিনজারের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল সিআইএর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল অভিযানের সূচনা। মার্কিন নেতারা তখন ‘শাসন পরিবর্তন’ যুগের ধারণায় বুঁদ হয়েছিলেন।

১৯৮০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএর কর্মকর্তা ছিলেন চাক কোগান। স্টিফেন কিনজারের বইয়ে তাঁর উদ্ধৃতিতে লেখা হয়েছে, ‘আমরা তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি থেকে বেরিয়ে এসেছি। আত্মবিশ্বাস বেশ নড়বড়ে ছিল। এক ধরনের হতাশা কাজ করছিল। সোভিয়েতরা এগিয়ে যাচ্ছিল আর আমরা ছিলাম প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে। হঠাৎ করেই এই পরিস্থিতি (আফগানিস্তান) আসে। সেটি ছিল মোড় ঘোরানোর সুযোগ।’ আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হয় ২০২১ সালে। 

এর পর সবচেয়ে বড় অভিযান চালানো হলো ভেনেজুয়েলায়। মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য ও গাজা ভূখণ্ড দখলের লক্ষ্যে আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। যার পেছনে মূল সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের। আর ইউরোপে খনিজসমৃদ্ধ ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখলে রাশিয়ার আগ্রাসন গত চার বছর ধরে চলছে।

আরও পড়ুন

×