ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

গোল্ডেন ডোম কী, গ্রিনল্যান্ডে কেন চালুর প্রস্তাব

গোল্ডেন ডোম কী, গ্রিনল্যান্ডে কেন চালুর প্রস্তাব
×

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের জন্য গ্রিনল্যান্ডে গোল্ডেন ডোম সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ইলাস্ট্রেশন: সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৫:১৪ | আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৯:৫৯

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলছেন। এই প্রতিরক্ষার আওতায় থাকতে পারে শত শত স্যাটেলাইট এবং ভূমি থেকে আকাশপথের হামলা প্রতিহতের ব্যবস্থা।

এখনও এটি তাত্ত্বিক পর্যায়ে আছে। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডেও একটি গোল্ডেন ডোম থাকা জরুরি। এটি স্থাপনের জন্যই ভূখণ্ডটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া দরকার।

গোল্ডেন ডোম কী
কিছুদিন আগে গ্রিনল্যান্ড দখল প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইউরোপের আটটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ সেই পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এর বদলে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, একটি চুক্তির রূপরেখা প্রক্রিয়াধীন। এটি বাস্তবায়িত হলে গ্রিনল্যান্ডে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারের দুই আকাঙক্ষাই পূরণ হবে। যদিও চুক্তিটির বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি। 

গত বছরের মে মাসে গোল্ডেন ডোম পরিকল্পনা তুলে ধরেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

গোল্ডেন ডোম ব্যবস্থা আংশিকভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ থেকে। ২০১১ সাল থেকে আয়রন ডোম দিয়ে  ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলা প্রতিহত করে আসছে তেল আবিব। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গোল্ডেন ডোমে ভূমি ও মহাকাশ উভয় ক্ষেত্রে সক্ষমতা থাকবে। এটি সম্ভাব্য হামলার চারটি প্রধান ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও প্রতিহত করতে পারবে।

অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের (এএসপিআই) প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস বলছেন, গোল্ডেন ডোম এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে, এটিতে কোনো ফাঁক রাখা হয়নি। অর্থ্যাৎ, কোনো ক্ষেপণাস্ত্র একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষা বলয় অতিক্রম করতে পারবে না।

ম্যালকম আরও বলেন, সমরশক্তিতে রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে। সেগুলো প্রতিহতে গোল্ডেন ডোমকে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। যদিও পুরোপুরি ফাঁকহীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলে অন্তত পরমাণু ওয়ারহেড পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমাতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তিনি এই কর্মসূচির জন্য ১৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছেন। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ব্যবস্থাটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই বরাদ্দ ও সময়সীমা বাস্তবসম্মত নয়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা গোল্ডেন ডোম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারবে। ছবি: সংগৃহীত

নীতি বিষয়ক সংস্থা আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো টড হ্যারিসনের হিসাব অনুযায়ী, ২০ বছর ধরে এই কর্মসূচি সচল রাখলে খরচ হতে পারে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ঢালকে শতভাগ সক্ষম করে গড়ে তুলতে ব্যয় হতে পারে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।

সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফেরেশন নামের সংস্থার গত বছরের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোল্ডেন ডোম কর্মসূচিটি তখনও ধারণার পর্যায়ে ছিল। তবে মার্কিন কংগ্রেস ইতোমধ্যে গবেষণা, সমীক্ষা ও ‘গোপন উন্নয়ন প্রকল্পের’ জন্য অর্থ বরাদ্দ শুরু করেছে।

গ্রিনল্যান্ডে কেন গোল্ডেন ডোম?
যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) কিংবা পরমাণু হামলা চালানো হলে সেটি গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে উত্তর মেরু অতিক্রম করবে। ফলে গোল্ডেন ডোম স্থাপনের লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ডকে সুরক্ষিত করা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানোর আগেই সেটিকে ভূপাতিত করা। 

বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক স্পেস বেস থেকে রাডার ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়। সেখান থেকে যেকোনো হামলার আগাম সতর্ক সংকেত পায় ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকারী রাডার ব্যবস্থা আছে কানাডার উত্তরে ও আলাস্কায়। সেটি পরিচালনা করে নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড (নোরাড)।

সুইজারল্যান্ডে ন্যাটো মহাসচিবের সঙ্গেও গোল্ডেন ডোম নিয়ে আলোচনা করেছেন ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

নোরাড যে সীমা পর্যন্ত রাডার পরিচালনা করতে পারে তার উত্তরে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান। সুতরাং সেখানে গোল্ডেন ডোমের মহাকাশভিত্তিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা হলে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে বুস্ট ও মিড-কোর্স পর্যায়েই ভূপাতিত করা সম্ভব বলে মনে করেন ম্যালকম ডেভিস। বুস্ট বলতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নের প্রাথমিক স্তরকে বোঝায়। এর স্থায়ীত্ব হয় উৎক্ষেপণের পর ১ থেকে ৫ মিনিট। 

ম্যালকম ডেভিস বলেন, বাস্তবতা হলো উৎক্ষেপণ করা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা প্রায় অসম্ভব। তাই যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ডেন ডোম প্রকল্পের বিপরীতে চীন, রাশিয়ার কৌশল হতে পারে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়ারহেডের সংখ্যা আরও বাড়ানো।

প্রতিরক্ষার চেয়ে রাজনীতি বেশি
যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন আর্কটিক ভূখণ্ডটিতে প্রয়োজনীয় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ পায়। বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, আর্কটিক নিরাপত্তা ও গোল্ডেন ডোম নিয়ে তিনি ন্যাটোর মহাসচিবের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আলোচনা করেছেন। তারা ভবিষ্যতে একটি চুক্তির রূপরেখায় একমত হয়েছেন।

ম্যালকম ডেভিস বলছেন, সম্ভাব্য চুক্তিটি ইঙ্গিত দেয়- গ্রিনল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিগুলোর আশপাশে কিছু ‘সার্বভৌম এলাকা’ থাকবে। সেখানে মোতায়েন থাকবে মার্কিন সেনা। তবে সামগ্রিকভাবে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনেই থাকবে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের অধ্যাপক স্টিফেন ফ্রুহলিং বলছেন, গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন গোল্ডেন ডোম কর্মসূচি যতটা সামরিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগে থেকেই কিছু মহাকাশভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও রাডার আছে। তারা সেগুলো আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও নিয়েছে। এখন নিরাপত্তার কথা বলে গ্রিনল্যান্ডে গোল্ডেন ডোম স্থাপন করতে চাইছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই গোল্ডেন ডোম কেবল একটি নির্দিষ্ট উপাদান নয়। এর সঙ্গে আরও কিছু আছে।  

(এবিসি নিউজ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেদন অবলম্বনে)

আরও পড়ুন

×