হরমুজ ঘিরে মুদ্রাযুদ্ধ, ডলারের বিরুদ্ধে একাট্টা ইরান-চীন
আলজাজিরার বিশ্লেষণ
সংগৃহীত কোলাজ
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৫:২৫ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৫:২৮
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলায় গত এক মাসের বেশি সময় বিশ্ব অর্থনীতি এক প্রকার বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। এ সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও চীনে প্রচুর পরিমাণে তেল রপ্তানি করেছে ইরান। চীন এতদিন যে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের আধিপত্য খর্ব করার চেষ্টায় ছিল, ইরান যুদ্ধ সেই প্রচেষ্টায় গতি আনে। ডলারের আধিপত্যের অবসানের লক্ষ্যে একসঙ্গে নেমেছে দুই দেশ। হরমুজ ঘিরে এই কার্যক্রম খানিকটা এগিয়েছে।
আলজাজিরা লিখেছে, বৈশ্বিক তেল বাজারে ডলারের আধিপত্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জেপি মরগ্যান চেজের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে নিষ্পত্তি হয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রধান পথ এই প্রণালি। এখানে তেহরান ও বেইজিং ডলারের বিকল্প হিসেবে চীনা ইউয়ানকে শক্তিশালী করার উপায় খুঁজে পেয়েছে।
একাধিক প্রতিবেদন অনুসারে, হরমুজে ইরানি কর্মকর্তারা টোল বুথ ব্যবস্থার অধীনে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ইউয়ানে ট্রানজিট ফি আদায় করছে, যা চীনের মুদ্রার মাধ্যমে সহজতর হওয়া চীন-ইরান সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সহযোগিতার সর্বশেষ উদাহরণ। গত সপ্তাহে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হরমুজে অর্থ পরিশোধের জন্য ইউয়ান ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জিম্বাবুয়েতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস গত শনিবার সামাজিক মাধ্যমে বলেছে, বৈশ্বিক তেলের বাজারে পেট্রোডলারের পরিবর্তে ‘পেট্রোইউয়ান’ যুক্ত করার সময় এসেছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ আলজাজিরাকে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চোখে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেওয়ার মতো কাজ করছে, যা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো। তাছাড়া ব্রিকস দেশগুলোর বাণিজ্যকে ইউয়ানে পুনর্মুদ্রণ করার দিকে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে চীন।
‘বহুমেরু’ আর্থিক বিশ্ব চায় চীন
তেহরান ও বেইজিং উভয়ের জন্যই ইউয়ানের মূল্যবৃদ্ধি একটি লাভজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। ইউয়ানের ব্যবহার চীন ও ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করবে। দুপক্ষের মধ্যে বাণিজ্যের খরচও কমাবে।
যুক্তরাজ্যের কিল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক বুলেন্ট গোকায় আলজাজিরাকে বলেন, মার্কিন আর্থিক আধিপত্যের প্রতি এই চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব ও পেট্রোডলারের অপরিহার্য ভূমিকা ইরানের কাছে পরিষ্কার। তিনি বলেন, পেট্রোইউয়ান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চীন ‘বহুকেন্দ্রিক আর্থিক বিশ্ব’ তৈরির পথে এগিয়ে যেতে চায়। ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ভারসাম্য আনবে।
ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি কেনে চীন এবং ইউয়ানে এই ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হওয়ায় দেশটি ছাড়ে তেল কেনার সুবিধা ভোগ করে। এর বিনিময়ে ইরান চীন থেকে বিপুল পরিমাণে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক এবং শিল্প উপাদান আমদানি করে।
কেপলার ও ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্সের তথ্যমতে, সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান এক কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যার বেশির ভাগই চীনে গেছে। ২০২৪ সালে এক ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছিলেন, ইউয়ান একদিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সাধারণ মুদ্রায় পরিণত হবে এবং ‘বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা’ অর্জন করবে।
ডলারের আধিপত্য ‘ক্ষয়’ হচ্ছে
ব্রাসেলসের ইউরোপীয় সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হোসুক লি-মাকিয়ামা বলেন, চীন যদি ডলারের আন্তর্জাতিকীকরণের সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিমও খায়, তাতে তেহরানের খুব একটা ক্ষতি নেই। কারণ চীন ইরানের প্রায় সব তেল কিনে নেয় এবং তাদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক বিদ্যামন। ইরান চীনের কাছ থেকে এমন সব যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য পায়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
পরামর্শক সংস্থা ডিফারেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টাইনবক বলেন, সময়ের সঙ্গে ইউয়ানের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু খাতে মার্কিন আধিপত্যকে ‘ক্ষয়’ করতে পারে। হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ রোগফ মনে করেন, যুদ্ধে যদি ইরান ও চীন জয়ী হয়, তবে অনেক দেশই আর্থিক ব্যবস্থায় ডলার থেকে সরে আসতে পারে।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইসরায়েল
- চীনের হুমকি
- চীন
