ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আর্টেমিস-২ অভিযান

সফল সমাপ্তি, নতুন আশা

২০২৮ সালে চাঁদে স্থায়ী বসতি গড়ার অঙ্গীকার

সফল সমাপ্তি, নতুন আশা
×

আর্টেমিস-২ অভিযানের চার নভোচারী শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে অবতরণ করেন। গতকাল উদ্ধারকারী জাহাজ জন পি মুরথায় ওরিয়ন ক্যাপসুলের সামনে ফটোসেশনে -নাসা

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম চন্দ্রাভিযান শেষে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে নিরাপদে অবতরণ করেছে নাসার আর্টেমিস-২ অভিযানের চার নভোচারী। বাংলাদেশ সময় গতকাল শনিবার ভোরে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে ওরিয়ন মহাকাশযানটি অবতরণের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটল ১০ দিনের এক ঐতিহাসিক যাত্রার। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানববাহী যান চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে ফিরে এলো। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানের মাধ্যমে নাসা কেবল চন্দ্রজয়ের নতুন যুগের সূচনা করেনি, বরং চীনকে পেছনে ফেলে একবিংশ শতাব্দীর মহাকাশ প্রতিযোগিতায় মার্কিন আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার বার্তাও দিয়েছে। 

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় ওরিয়ন মহাকাশযানটি চরম প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। ঘণ্টায় ২৫ হাজার মাইল বেগে বায়ুমণ্ডলে আঘাত করায় ঘর্ষণের ফলে ক্যাপসুলের বাইরের তাপমাত্রা ওঠে প্রায় দুই হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই সময় তৈরি হওয়া প্লাজমা স্তরের কারণে অল্প সময়ের জন্য হিউস্টনে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে নভোচারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে পরে অভিযানের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই নিয়ন্ত্রণকক্ষে স্বস্তি ফিরে আসে। নিয়ন্ত্রণকক্ষকে ওয়াইজম্যান বলেন, ‘হিউস্টন, যোগাযোগ ঠিক আছে। আমরা আপনাদের স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছি।’

ক্যাপসুলটি যখন ১১ মাইল উচ্চতায় পৌঁছায়, তখন পর্যায়ক্রমে ওরিয়নের ১১টি প্যারাসুট খুলতে শুরু করে। বিশাল তিনটি প্রধান প্যারাসুট যখন পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়, তখন ওরিয়নের গতি ঘণ্টায় ৩২৫ মাইল থেকে কমে মাত্র ১৭ মাইলে নেমে আসে। এরপরই এটি ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে নিরাপদ অবতরণ করে। 

বিবিসির বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদদাতা পল্লব ঘোষের বর্ণনা অনুযায়ী, পানি আপাতদৃষ্টিতে নরম মনে হলেও উচ্চগতিতে থাকা মহাকাশযানের জন্য তা ছিল শক্ত দেয়ালের মতো। ওরিয়ন যখন মহাসাগরের উপরিভাগে আঘাত করে, তখন প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনি অনুভব করেন নভোচারীরা। এর পরপরই ক্যাপসুলের নিচের পাঁচটি কমলা রঙের এয়ারব্যাগ খুলে গিয়ে উত্তাল সমুদ্রে ওরিয়নকে সোজা ও স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। টানা ১০ দিন ‘জিরো গ্রাভিটি’ বা ওজনহীনতায় থাকার পর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে ফিরে এসে প্রতিটি দুলুনিই নভোচারীদের কাছে তীব্র অনুভূত হচ্ছিল। 

উদ্ধার অভিযান 
অবতরণস্থলের পাশে আগে থেকে মোতায়েন ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘জন পি মুর্থা’। নৌবাহিনীর ডুবুরিরা দ্রুত নৌকা নিয়ে ওরিয়নের কাছে পৌঁছে যান। তারা প্রথমে ক্যাপসুলের চারপাশের বাতাস ও পানি পরীক্ষা করেন, যাতে কোনো বিষাক্ত গ্যাস নেই তা নিশ্চিত করা যায়।

এরপর ক্যাপসুলের দরজা খোলা হলে প্রথমবারের মতো সমুদ্রের নোনা বাতাসের ঘ্রাণ পান নভোচারীরা। একে একে তাদের হেলিকপ্টারে করে যুদ্ধজাহাজে নেওয়া হয়। কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান সবার শেষে ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে আসেন। চার নভোচারীকে যুদ্ধজাহাজে নেওয়ার পর তাদের পালস, রক্তচাপ, মস্তিষ্ক ও নার্ভ সিস্টেম ও ভারসাম্য পরীক্ষা করা হয়। পরে জানানো হয়, চারজনই সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। 

বিশ্বকে উপহার 
নাসার অ্যাসোসিয়েট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অমিত কেশাত্রিয়া জানিয়েছেন, হিউস্টনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এখন উপচেপড়া আনন্দ। এই অভিযান প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছে এবং এটিকে তিনি বিশ্বের জন্য একটি উপহার হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, ক্রুদের জন্য নির্ধারিত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে এখনও কিছু কাজ বাকি আছে। তবে মহাকাশচারীরা দেখতে দারুণ ভালো অবস্থায় আছেন। দেখুন, আমরা একসঙ্গে কাজ করলে কী করতে পারি। সমস্যা যত কঠিনই হোক না কেন, সেটি আমরা সমাধান করতে পারি। 

আর্টেমিস-২ অভিযানে ছিলেন মার্কিন নভোচারী রেইড ওয়াইজম্যান (কমান্ডার), ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। অভিযানের নবম দিনে তারা পৃথিবী থেকে দুই লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে পৌঁছে যান। এটি ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক অ্যাপোলো-১৩ মিশনের দূরত্বের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে, যা বর্তমানে মানববাহী মহাকাশ যানের ইতিহাসে দীর্ঘতম পথ। 
এবারের অভিযানে চাঁদে যাওয়া ও আসার যাত্রায় মোট ছয় লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন চার নভোচারী। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্থানীয় সময় ২ এপ্রিল সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোরে) সফর শুরু করেছিল ওই মহাকাশযান। 

আর্টেমিস-২ অভিযান কেবল কারিগরি সাফল্যের জন্য নয়, সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকেও অনন্য। এই অভিযানের মাধ্যমেই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ভিক্টর গ্লোভার, প্রথম নারী হিসেবে ক্রিস্টিনা কোচ এবং প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে জেরেমি হ্যানসেন চাঁদের পথে পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়লেন। 

অভিযানে তারা চাঁদের অন্ধকার দিক পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি তারা মহাকাশযানের ভেতর থেকেই বিরল সূর্যগ্রহণ ও উল্কাপাত প্রত্যক্ষ করেছেন। এমনকি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মহাকাশযানের টয়লেট বিকল হলে ক্রিস্টিনা কোচ তা মেরামত করে দক্ষতার পরিচয় দেন। 

নাসার প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান নভোচারীদের উদ্ধারকারী জন পি মুর্থা যুদ্ধজাহাজ থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, এটি কেবল শুরু। আমরা এখন নিয়মিত নভোচারীদের চাঁদে পাঠাতে সক্ষম। আর্টেমিস-২-এর সফলতাই আমাদের ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে সরাসরি মানুষের পদচিহ্ন রাখা এবং সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে। 

পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে নভোচারীদের পরবর্তী গন্তব্য এখন হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টার। এই ১০ দিনের অভিযানে তারা কেবল রেকর্ডই ভাঙেননি, বরং পৃথিবীকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। 

আরও পড়ুন

×