বিশ্লেষণ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ‘চিকেন গেম’ অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ অবরোধের পদক্ষেপ যুদ্ধকে ভিন্ন মাত্রা দিতে পারে। প্রতীকী ছবি
সিএনএন
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:৪৫ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:০৬
ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ-অবরোধ অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। এই অবরোধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে তেহরান-ওয়াশিংটনের পাশাপাশি অন্য দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ‘চিকেন গেমে’ আপাতত ইরানকেই জয়ী বলে মনে হচ্ছে।
‘গেম অব চিকেন’ তত্ত্ব অনুযায়ী, সংঘাতে দুই পক্ষ একে অপরের দিকে ধ্বংসাত্মকভাবে আগায়। প্রথমে যে পিছু হটে সে হেরে যায়। তবে কেউই যদি পিছু না হটে তবে উভয়পক্ষই ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হয়।
হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের নির্দেশ দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাতের যে নতুন ধাপ শুরু করেছেন, তাতে মার্কিন সেনাদের সরাসরি বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে। কারণ এই অবরোধ কার্যকর করতে হলে সেখানে বিপুল সংখ্যক সামরিক উপস্থিতি দরকার। তাই চলমান অবরোধ দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। প্রথমত, জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম এবং দ্বিতীয়ত, মার্কিন সেনাদের লাশের সারি। এর কোনোটিই আমেরিকার জনগণ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
তাহলে ট্রাম্প এমন উদ্যোগ নিলেন কেন? তিনি সম্ভবত বাজি ধরেছেন যে, এই সংঘাতে ইরানই প্রথম পিছু হটবে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, চরম অর্থনৈতিক সংকটেও তেহরানের টিকে থাকার নজির আছে। এই ইতিহাসই ইরানকে ‘চিকেন গেমে’ এগিয়ে রাখছে।
_1776257774.jpg)
রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডার প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান এবং সিআইএ’র সাবেক বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফট বলছেন, তেল নিয়ে চলা এই ‘গেম অব চিকেন’ বা স্নায়ুযুদ্ধ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় কোন পক্ষ আগে পিছু হটার মানসিকতা দেখাবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় কার বেশি ক্ষতি?
রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অচলাবস্থা বোঝাতে প্রায়ই ‘গেম অব চিকেন’ তত্ত্বের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা এবং জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথে অবরোধের চেষ্টা তত্ত্বটিকে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে।
যুদ্ধের মাঝেও ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এখন তাদের বন্দর ব্যবহার করা জাহাজগুলো অবরোধ করা হলে বাজার থেকে তেলের সরবরাহ উধাও হয়ে যেতে পারে। বিশ্বের মোট চাহিদার বিপরীতে ইরানের রপ্তানি করা তেলের পরিমাণ খুব বেশি নয়, মাত্র ২ শতাংশ। কিন্তু এই রপ্তানিতেও বাধা দেওয়া হলে তেহরান হরমুজ ঘিরে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে। তখন সরু জলপথটি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ (১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল) তেল পরিবহন করা হয়, সেটিও বন্ধ হয়ে যাবে।
অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে কেমন প্রভাব পড়তে পারে সেটির আভাস এরইমধ্যে পাওয়া গেছে। গত সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আতঙ্কিত মার্কিন জনগণও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই বাড়তি চাপ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
_1776258015.jpg)
অপরদিকে একটি সফল নৌ-অবরোধ ইরানের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিকেন্দ্রিক আর্থিক পরিষেবা সংস্থা ‘পিকারিং এনার্জি পার্টনার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিংয়ের মতে, এই অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানিকে স্তব্ধ করে দেবে। তাদের আয়ের প্রধান উৎসটি বন্ধ হয়ে যাবে। ওমান উপসাগরের একটি বন্দরে যাওয়ার জন্য ইরানের মাত্র একটি পাইপলাইন আছে। এর রপ্তানি ক্ষমতা দিনে মাত্র ২ লাখ ব্যারেল। মার্কিন নৌবাহিনী সেই পথটিও বন্ধের চেষ্টা করতে পারে।
আর্থিক নীতি বিশ্লেষণকারী সংস্থা পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্স-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো আদনান মাজারেয়ি বলেন, অবরোধের পদক্ষেপে ইরান নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতির মাত্রা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
পিছু হটবে কে?
শিপিং ডেটা বিশ্লেষণের সংস্থা কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জোহানেস রাউবলের মতে, বর্তমানে সমুদ্রে ভাসমান মজুত এবং পরিবহনাধীন কার্গো মিলিয়ে ইরানের প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আছে। মার্কিন নৌবাহিনী এর কিছু অংশ হয়তো আটকাতে পারবে, কিন্তু তেলের এই বিশাল প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা অত্যন্ত জটিল কাজ।
অপরদিকে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রেও ইরানের ঝুলিতে বেশ কিছু পুরনো কৌশল আছে। বাহরাইনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো হাসান আলহাসানের মতে, অতীতে ইরান তাদের তেল ইরাকের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে অথবা পাকিস্তানের মাধ্যমে পরিবহন করেছে।
_1776258196.jpg)
তবে টিকে থাকার সক্ষমতা যার যতটুকুই থাকুক, লড়াই তো একটা সময়ে থামবে। তখন পিছু হটবে কে?
জোহানেস রাউবলের মতে, ‘পরিস্থিতি ইরানের পক্ষে কথা বলছে।’ সিআইয়ের সাবেক বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফট বলছেন, ‘ইরান এর আগেও ভয়াবহ সব নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করেছে, কিন্তু তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার থেকে পিছিয়ে যায়নি।’ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক কারেন ইয়াংও তাঁর ভোট ইরানের পক্ষে দিয়েছেন। অর্থ্যাৎ, গেম অব চিকেনে ইরানই টিকে থাকতে সক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের নতুন ধাপ
ইরান হরমুজ প্রণালিতে একক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাইছে। নৌ অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত সেই প্রচেষ্টায় বাধা দিতে চায়।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন তেলবাহী জাহাজে পাহারা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তা কাজে দেয়নি। এবারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানের বন্দর ব্যবহার করা জাহাজগুলো সাগরে আটকে দেবে মার্কিন নৌবাহিনী। যেটির লক্ষ্য তেহরানের তেল রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করা।
নতুন করে যুদ্ধ বাঁধানোর জন্য এই উসকানি যথেষ্ট হতে পারে। এরইমধ্যে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকিও শোনা গেছে। সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘মার্কিন অবরোধের কাছে যাওয়া ইরানি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে।’ জবাবে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা বলেছেন, বাধা দিতে আসা যেকোনো মার্কিন জাহাজকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠানো হবে।
এগুলো কেবল মুখের কথা নয়; নৌবাহিনী দুর্বল হলেও ইরান ছোট স্পিডবোট এবং সস্তা ড্রোন দিয়ে সফলভাবে জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম। এ ছাড়া, তারা সংঘাতের পরিসর মধ্যপ্রাচ্যেও ছড়িয়ে দিতে পারে। সিআইয়ের সাবেক বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফটের মতে, ট্রাম্প যদি নিজের দেওয়া হুমকি কার্যকর করেন, তাহলে ইরান এই অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে।
ক্রফট সতর্ক করে বলেন, ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তারা ইতোমধ্যেই লোহিত সাগরের জাহাজগুলোকে হয়রানি করছে। সৌদি আরবের পাইপলাইনেও হামলা চালিয়েছে।
