ট্রাম্পের শুল্ক পেরোলেও ইরান যুদ্ধে চাপে চীনের অর্থনীতি
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২১
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর শুল্ক বাধা একসময় সফলভাবেই মোকাবিলা করেছিল চীন। কিন্তু চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধে চাপে পড়েছে চীনের শক্তিশালী উৎপাদন খাত। একদিকে আকাশচুম্বী উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে কমতে থাকা চাহিদা এখন বেইজিংয়ের মাথাব্যথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর অলিগলিতে এখন হতাশার ছাপ। গুয়াংডং প্রদেশের ফোশান শহরের অস্থায়ী কারখানার সামনে কাজের অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের কণ্ঠে ফুটে উঠছে চরম অনিশ্চয়তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, ‘কেউ বোঝে না আমাদের জীবন কতটা কঠিন। আমরা কেবল কাজই করে যাই। আমাদের কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই।’
সস্তা পণ্য উৎপাদন থেকে সরে এসে চীন এখন উন্নত প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাঝেই যুদ্ধের প্রভাব তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। গুয়াংডংয়ের দক্ষিণের শিল্পোন্নত প্রদেশ ফোশানে বর্তমানে মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ সংযোজন বা প্লাস্টিক পণ্য তৈরির মতো কাজে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে ঘণ্টায় মাত্র ১৮ থেকে ২০ ইউয়ান (প্রায় ৩ ডলার)। এমনকি ১৪ ঘণ্টার দীর্ঘ কর্মদিবসে টয়লেট পরিষ্কারের মতো কাজ করে একজন শ্রমিকের আয় হচ্ছে মাত্র ১৫০ ইউয়ান (প্রায় ২০ ডলার)। চীনের এই আধুনিক যুগে যা জীবনধারণের জন্য একেবারেই নগণ্য।
থমকে গেছে রপ্তানি বাণিজ্য ও লজিস্টিকস
গুয়াংজুতে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম কাপড়ের বাজারে এখন আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। জারা বা শেইনের মতো নামি ব্র্যান্ডের কাপড় এখান থেকেই সরবরাহ হয়। কিন্তু
হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় শিপিং রুটগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাপড় উৎপাদনের খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। একজন ব্যবসায়ীর মতে, সামগ্রিক উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। কিন্তু ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে রাজি না হওয়ায় গুদামে অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় জমছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির সাফল্যের পথেও বড় বাধা
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও চীনের বড় আশার জায়গা হলো বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি)। চায়নিজ প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, চীন গত মার্চে সাড়ে তিন লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানি করেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৩০ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি। কিন্তু যুদ্ধ এই সাফল্যের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানিকারক জয়েস লিউ জানান, গত বছর তাদের ৯০ শতাংশ গাড়ি মধ্যপ্রাচ্যে যেত। কিন্তু যুদ্ধের কারণে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য প্রায় বন্ধ। বিপুল পরিমাণ গাড়ি এখন চীনের বন্দরগুলোয় আটকে আছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বেইজিং
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এক কঠিন সমীকরণের সামনে। একদিকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে, আমেরিকার সঙ্গেও তিক্ততা এড়াতে চাচ্ছে। বেইজিং চায়, আগামী মে মাসে নির্ধারিত ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের শীর্ষ সম্মেলনটি সফল করতে, যাতে বাণিজ্য যুদ্ধ আর প্রকট না হয়।
চীনের অর্থনীতি বর্তমানে ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও, তৃণমূলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য এই পরিসংখ্যান কেবলই একটি সংখ্যা। মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, চীনের উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি ততই নড়বড়ে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
