এক্সপ্লেইনার
স্টারমারকে যেভাবে সরাতে পারে লেবার পার্টি, সম্ভাব্য চারটি পথ
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার (সামনে)। ছবি: এএফপি
দ্য গার্ডিয়ান
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ১৪:০৯ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ১৮:২৪
লেবার পার্টির অনেক এমপি মনে করেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনে লড়ার জন্য কিয়ার স্টারমার খুব বেশিদিন দলের নেতৃত্বে টিকে থাকতে পারবেন না। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবারদের বিপর্যয় হয়েছে। এতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবির গুঞ্জনও এখন জোরালো। তবে তাঁর বিদায় ঘণ্টা কীভাবে বাজবে সে বিষয়ে এমপিরা এখনো একমত হতে পারেননি।
লেবার পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো দলীয় নেতাকে পদ থেকে সরানো বেশ কঠিন কাজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এখন পর্যন্ত কোনো নেতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয়নি। কেবল টনি ব্লেয়ারের মতো কেউ কেউ নিজ দলের এমপিদের চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
গত শনিবার লেবার এমপি ও সাবেক জুনিয়র মন্ত্রী ক্যাথরিন ওয়েস্ট নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে পুরো পরিস্থিতি ওলটপালট করে দিয়েছেন। নতুন করে আরো কয়েক এমপি স্টারমারের পদত্যাগের পক্ষে কথা বলেছেন। এখন লেবার পার্টি যদি সত্যিই স্টারমারকে সরাতে চায়, তবে তাদের সামনে চারটি সম্ভাব্য পথ খোলা আছে।
৮১ এমপি রুল
লেবার পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দায়িত্বরত কোনো নেতাকে সরাতে হলে তাঁর পরিবর্তে লড়াই করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে সংসদীয় দলের ২০ শতাংশ সদস্যের (বর্তমানে ৮১ এমপি) লিখিত সমর্থন পেতে হয়। যিনি এই পরিমাণ সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন, তিনি নেতৃত্বের লড়াইয়ে প্রার্থী হতে পারবেন। এক্ষেত্রে বর্তমান নেতা যদি পদে বহাল থাকতে চান, তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন।

স্টারমারের বিরোধীতা করা ক্যাথরিন ওয়েস্টের কাছে এতো সংখ্যক এমপির সমর্থন আছে- এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে তাঁকে বর্তমানে একজন ‘স্টকিং হর্স’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, তিনি মূলত অন্য কোনো শক্তিশালী প্রার্থীর হয়ে পরিস্থিতি যাচাই করতে লড়াইয়ে নামার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
স্টারমার আগেই জানিয়েছেন, নেতৃত্ব রক্ষার লড়াই যদি অনিবার্য হয় তবে তিনি আবারও প্রার্থী হবেন। এর অর্থ হলো, দলের অন্য যেসব নেতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য লড়াই করবেন তাদের বিরুদ্ধে স্টারমারকে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। এরপর বাকি লেবার এমপিরা ভোটের মাধ্যমে দলের ও দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বাছাই করবেন।
মূলত এ কারণে কনজারভেটিভ পার্টির তুলনায় লেবার পার্টির নেতা পরিবর্তন করা বেশি কঠিন। কনজারভেটিভদের নিয়ম অনুযায়ী, এমপিরা নিজেদের নাম প্রকাশ না করেই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা জানাতে পারেন। আগেভাগে কোনো বিকল্প প্রার্থীর নামও সামনে আনতে হয় না।
প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে স্টারমারের বিরুদ্ধে কারা প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন? গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার- এই তিনজনের ঘনিষ্ঠরা দাবি করেছেন, তাদের কাছে নেতৃত্ব বাছাইয়ের ভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন আছে। তবে মুখে সমর্থন জানানো এমপিরা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীর পক্ষে সই করবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
প্রকাশ্য চাপ প্রয়োগ
লেবার পার্টির প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে নেতার ওপর প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। যাতে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান। এর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো- মন্ত্রীদের গণপদত্যাগ। এমনটা ২০২২ সালে বরিস জনসনের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। ৩০ জন মন্ত্রীর পদত্যাগের কারণে তাঁর পক্ষে সরকার চালানো অসম্ভব হয়ে যায়।

লেবার পার্টির আঞ্চলিক নেতারা যদি একযোগে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন, তবে সেটিও স্টারমারের টিকে থাকা কঠিন করে তুলবে।
স্থানীয় সময় সোমবার স্টারমারের অবস্থান আরো দুর্বল হতে শুরু করেছে। মন্ত্রিসভার সদস্যরা তাঁকে বিদায়ের সময়সূচী বা ‘টাইমটেবল’ নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন। নিজ দলের ৭০ জনের বেশি এমপি প্রকাশ্যে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
গ্রে স্যুটের প্রভাবশালীরা
প্রকাশ্যে অবাধ্যতা না দেখিয়ে লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ এমপিরা পর্দার আড়ালে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্টারমারকে পদত্যাগে রাজি করানোর পথ বেছে নিতে পারেন। দ্য গার্ডিয়ান জানতে পেরেছে, সোমবার চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রী স্টারমারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি।

অতীতে কনজারভেটিভ নেতা ইয়ান ডানকান স্মিথ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা চার্লস কেনেডির মতো রাজনীতিবিদদের অনেকটা নিঃশব্দে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই উপায় অবলম্বন করে স্টারমার নিজের মর্যাদা বজায় রেখে পদত্যাগের সুযোগ পেতে পারেন।
অনাস্থা ভোট
নেতৃত্ব বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিক ভোট আয়োজনের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংসদীয় অনাস্থা প্রস্তাব তোলা লেবার এমপিদের জন্য অনেকটা সহজ পথ। এতে হেরে গেলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর পদত্যাগের বিশাল চাপ তৈরি হয়। তবে যুক্তরাজ্যের আইনে অনাস্থা ভোটের ফলাফল মানাটা বাধ্যতামূলক নয়, বরং বিষয়টি নৈতিকতার দিক থেকে দেখা হয়। সেক্ষেত্রে স্টারমার চাইলে ফলাফল না মেনে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার পথ বেছে নিতে পারেন।
এমনটা হলে লেবার এমপিদের ফের নেতৃত্ব বাছাইয়ের ভোটের দিকে যেতে হবে।
