ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ককরোচ জনতা পার্টি

টিয়ার শেল থেকে টিকটকের রাজনীতি

টিয়ার শেল থেকে টিকটকের রাজনীতি
×

সামাজিক মাধ্যমনির্ভর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির লোগো। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

 সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ১২:৪৬ | আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ | ১৭:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

একদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে চাকরি হারানোর শঙ্কা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে প্রতিশ্রুতিনির্ভর রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?

এর উত্তরের সর্বশেষ উদাহরণ ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। বেকার তরুণদের ককরোচ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করার একটি মন্তব্য দেশটির ডিজিটাল ভূখণ্ড ও সরকারের ভিত অনেকটাই কাঁপিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটির সামাজিক মাধ্যমের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।

কিন্তু সিজেপি কী করেছে? ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে অ্যাকাউন্ট খুলে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন বিষয়কে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছে, মিম বানিয়েছে। তাতেই ভিতে কম্পন অনুভব করেছে ক্ষমতাসীনরা।

এক দশক আগেও কোনো ক্ষোভের ভাষা ছিল রাজপথের ব্যারিকেড, টিয়ার গ্যাসের শেল আর স্লোগান-পোস্টার। বর্তমানে সেটির রূপান্তর ঘটেছে ভার্চুয়াল স্পেসের ব্যঙ্গাত্মক মিম, এআই-জেনারেটেড অ্যান্থেম আর ফেসবুক, টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যমের রিলস ও অ্যালগরিদমিক ঝড়ে।

ঝড়ের উৎস যেখানে
চলতি মাসের শুরুর দিকের ঘটনা। ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষায় (নিট-ইউজি) অংশ নেন প্রায় ২৩ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থীদের আশায় গুঁড়েবালি হতে বেশিদিন সময় লাগেনি।

৩ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠলে তা ১২ মে বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের হতাশা ও বিতর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দেয় দেশটির প্রধান বিচারপতির করা একটি মন্তব্য। ভিন্ন একটি প্রসঙ্গে তিনি তরুণদের তেলাপোকা বা ককরোচের সঙ্গে তুলনা করেন। 

এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার বানিয়ে তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতাসীনদের ভিত নাড়িয়ে দিতে ‘তেলাপোকা’দের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই যথেষ্ট। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামের একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করে গত কয়েক দিনে ব্যঙ্গ করেছে সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার।

একটি জরিপের বরাত দিয়ে গত মাসে প্রকাশিত টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে যুব (২০-২৯ বছর বয়সী) বেকারত্বের হার গত দুই দশকের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০০৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর স্নাতক সম্পন্ন করেছেন প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থী। বিপরীতে বার্ষিক কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ২৮ লাখ স্নাতকের। ফলে চাকরির বাজারের জন্য যে হারে ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, সেটির সঙ্গে কর্মসংস্থান তৈরির প্রচেষ্টা তাল মেলাতে পারছে না। 

সিজেপি গঠনের পর আলজাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অবস্থানরত এই তরুণ বলেন, যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা সাধারণ নাগরিকদের তেলাপোকা আর পরজীবী মনে করেন। তাদের জানা উচিত, নোংরা ও পচা জায়গাতেই তেলাপোকার বংশবৃদ্ধি হয়। বর্তমানে ভারতের অবস্থাও ঠিক তেমন।

ঝড় কি পর্দায় মিলিয়ে যাবে?
তৃণমূল স্তরে কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার জন্য যেখানে প্রথাগত দলগুলোকে দশকের পর দশক কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, সেখানে সিজেপি গড়ে তুলেছে ‘ডিজিটাল কর্মী’ বাহিনী। এই কর্মীদের কাজ কেবল মিম শেয়ারিং, কমেন্ট সেকশনে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য এবং রিলস তৈরির মাধ্যমে আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে দেওয়া। এটি মূলত একটি অ্যালগরিদম-নির্ভর রাজনৈতিক সংগঠন, যার লক্ষ্য কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়, বরং ডিজিটাল স্পেসে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারণাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া। তাদের অনুসারী সংখ্যা সামাজিক মাধ্যমে মূল রাজনৈতিক দলগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।

তবে এই অনলাইন জনপ্রিয়তার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অনুসারীর সংখ্যা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ভোটে রূপান্তরিত হতে পারে না। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিজিৎ বলেছেন, এটির কেবল সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। এটি ভারতের রাজনৈতিক আলোচনা ও চিন্তাধারাকে বদলে দেবে। অনলাইনের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে রাজপথেও নামবে।

‘মিম’ কি ভবিষ্যতের রাজনীতি?
সিজেপির মতো মিম-চালিত ও প্রযুক্তিভিত্তিক আন্দোলনের এই জোয়ার বিশ্বজুড়ে এক নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ধরনের আন্দোলনের সবচেয়ে সফল আন্তর্জাতিক উদাহরণ হলো ইতালির ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’। 

ডয়চে ভেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে কৌতুক অভিনেতা বেপ্পে গ্রিলোর হাত ধরে একটি প্রতিবাদী নেটওয়ার্ক হিসেবে ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’ এর যাত্রা শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক শ্রেণিকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

গ্রিলো তাঁর জনপ্রিয় ব্লগ ও সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে ইতালির বেকার তরুণদের একত্রিত করেন। ইতালির দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বেকারত্বের ক্ষোভকে পুঁজি করে গ্রিলোর সেই অনলাইন আন্দোলন পরে একটি পুরোদস্তুর রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলটি ৩২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জোটের সহায়তায় সরকার গঠন করে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির রাজনৈতিক উত্থানও ছিল ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের ফসল। ইনস্টাগ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগের অন্যান্য প্ল্যাটফর্মকে নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন তিনি। পরে ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৭৩ শতাংশ ভোটে জয়ী হন। 

উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপান্তরের সাম্প্রতিক উদাহরণ হয়েছে বাংলাদেশ ও নেপাল।

আন্দোলনে কি বেকারত্ব কমে?
বাংলাদেশ ও নেপালে জেনজিরা আন্দোলন করেছিলেন চাকরির বৈষম্য ও দুর্নীতির প্রতিবাদে। আরও কয়েকটি দেশে এমন আন্দোলন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গত জানুয়ারিতে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির কেনেডি স্কুল। তারা লিখেছে, বিশ্বব্যাপী জেনজি আন্দোলনগুলো সফল হওয়ার পরও, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে। সর্বশেষ আন্দোলনগুলোতেও এমনটা দেখা গেছে। 

জেনজিরা যখন প্রযুক্তিকে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছে, তখন প্রযুক্তি খাতই বিশ্বে নতুন বেকারত্ব তৈরির শঙ্কা জাগিয়েছে। গত মার্চ মাসে একটি জরিপের তথ্য প্রকাশ করে এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআইর কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, বাজার গবেষণা, আর্থিক ব্যবস্থাপনার মতো খাতগুলো। মার্কিন বিজনেস সাময়িকী ফরচুন বলছে, এই প্রতিবেদনটি কর্মক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের চাকরিচ্যুতির আশঙ্কাকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এআই যেসব খাতে ভাগ বসাবে সেগুলোর মধ্যে আরও আছে– শিল্প ও গণমাধ্যম, শিক্ষা, অফিস প্রশাসন (অ্যাডমিন), প্রকৌশল, সেলস। অ্যানথ্রোপিক বলছে, এসব খাতে এআই এরই মধ্যে কাজ ভাগাভাগি করছে।

সরকার কী করবে
নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারদেরও দ্রুত মানিয়ে নিতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ। তিনি বলছেন, প্রযুক্তির উত্থানের কারণে যেমন শঙ্কা করা হচ্ছে, তেমনি সেখানে সম্ভাবনাও লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ, সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান তৈরির দিকেই মনোযোগ দিতে হবে।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুভার ইনস্টিটিউশনের সেমিনারে যোগ দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। সেখানে তিনি এআইর প্রভাব নিয়ে বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি যতটা আঁচ করতে পারছে, পরিবর্তন তার চেয়েও দ্রুত গতিতে ঘটছে।’

সেমিনারে সুনাকসহ অন্য অতিথিরা বলেন, পরিস্থিতি সামলাতে যে কোনো সরকারকে আরও শক্তিশালী এবং যুগোপযোগী কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে।
 

আরও পড়ুন

×