ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

মাইকেল জ্যাকসন: রাজনীতির বাইরে থেকেও এক রাজনৈতিক কণ্ঠ

মাইকেল জ্যাকসন: রাজনীতির বাইরে থেকেও এক রাজনৈতিক কণ্ঠ
×

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০২:৫৭

২৫ জুন। পৃথিবীর কোটি মানুষের কাছে দিনটি শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যুদিন নয়। এটি এমন এক কণ্ঠস্বরকে স্মরণ করার দিন, যিনি বিনোদনের মঞ্চকে মানবতা, প্রতিবাদ ও বিশ্ববিবেকের মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। ২০০৯ সালের এই দিনে পৃথিবী হারিয়েছিল মাইকেল জ্যাকসনকে। কিন্তু তার কণ্ঠ, বার্তা ও প্রশ্ন আজও প্রতিধ্বনিত হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে, ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে, বন উজাড়ের বেদনায় এবং বৈষম্যে আক্রান্ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে।

মাইকেল জ্যাকসনকে সাধারণত ‘কিং অব পপ’ হিসেবে স্মরণ করা হয়। কিন্তু তার শিল্পীসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। তিনি ছিলেন মানবতার পক্ষে এক বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক কণ্ঠস্বর। রাজনৈতিক নেতা না হয়েও তিনি রাজনীতি, যুদ্ধ, বর্ণবাদ, দারিদ্র্য, পরিবেশ ধ্বংস এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে এমনভাবে কথা বলেছেন, যা বহু রাষ্ট্রনেতার ভাষণের চেয়েও গভীরভাবে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছেছে।

তার মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে তার কিছু গান যেন আজকের পৃথিবীর জন্যই লেখা। গাজায় বোমা পড়ে, সুদানে মানুষ পালায়, ইউক্রেনে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, সমুদ্রের পানি বাড়ে, বনভূমি উধাও হয়, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে। এমন এক সময়ে মাইকেল জ্যাকসনের গান শুনলে মনে হয়, তিনি যেন দূর ভবিষ্যতের জন্যই সতর্কবার্তা রেখে গিয়েছিলেন।

কারণ মাইকেল জ্যাকসন কেবল পপসংগীতের রাজা ছিলেন না। তিনি ছিলেন পৃথিবীর পক্ষে গাওয়া এক নিঃসঙ্গ কণ্ঠ।

বিশ্বসংস্কৃতির ইতিহাসে খুব কম মানুষই মাইকেল জ্যাকসনের মতো জনপ্রিয়তা পেয়েছেন শৈশব থেকে মৃত্যুর পর অব্দি। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার ‘থ্রিলার’ আজও ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত অ্যালবাম। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে তার শ্রোতা ছিল। যখন পৃথিবী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তির দ্রুত গতির অনেক পেছনেই ছিলো। তার নাচ, পোশাক, মিউজিক ভিডিও, কনসার্টের কোরিওগ্রাফি - সবই ছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অংশ।

কিন্তু এই বিপুল সাফল্যের মাঝেও তিনি বারবার মানুষ ও প্রকৃতির দুর্ভোগের দিকে ফিরে গেছেন। যে সময়ে অধিকাংশ পপ তারকা প্রেম, বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতির গান গাইছিলেন, সে সময়ে মাইকেল লিখছিলেন ক্ষুধা, যুদ্ধ, বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস এবং মানবিক সংকট নিয়ে। সম্ভবত এখানেই তিনি অন্যদের থেকে আলাদা।

তিনি জনপ্রিয়তার সুবিধাভোগী ছিলেন, কিন্তু বিবেকের দায় থেকে মুক্ত ছিলেন না মৃত্যুর আগ অব্দি। ১৯৮৪ সালে ইথিওপিয়াসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। টেলিভিশনের পর্দায় কঙ্কালসার শিশুদের ছবি দেখে বিশ্ব বিবেক নড়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে মাইকেল জ্যাকসন ও লিওনেল রিচি ১৯৮৫ সালে লিখেছিলেন ‘উই আর দ্যা ওয়ার্ল্ড’ গানটি। এটি ছিল কেবল একটি গান নয়। এটি ছিল একটি নৈতিক ঘোষণা। সেখানে বলা হয়েছিল-আমরা একই পৃথিবীর মানুষ, তাই অন্যের দুর্ভোগ আমাদেরও দায়। গানটি মুক্তির পর বিশ্বব্যাপী বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং এর মাধ্যমে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য ৬ কোটি ডলারেরও বেশি তহবিল সংগৃহীত হয়েছিল। আজকের বিশ্বে যখন শরণার্থী, জলবায়ু উদ্বাস্তু এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে, তখন সেই গান নতুন অর্থে ফিরে আসে। রাষ্ট্রের সীমানা যেখানে মানুষকে ভাগ করে, মাইকেলের গান সেখানে মানুষকে একত্রিত করে।

মাইকেল জ্যাকসন নিজেকে কখনও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেননি। কিন্তু তার শিল্পে এমন এক রাজনৈতিক চেতনা ছিল, যা ক্ষমতার ভাষায় নয়, বিবেকের ভাষায় কথা বলে।১৯৮৭ সালের ‘ম্যান ইন দ্যা মিরর’ তার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ। গানটির মূল কথা হলো- পৃথিবী বদলাতে চাইলে প্রথমে নিজেকে বদলাও। শুনতে এটি ব্যক্তিগত নৈতিকতার কথা মনে হয়। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও দর্শন।

বর্তমান পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য মানুষকে দায়ী করি। মাইকেল প্রশ্ন তুলেছিলেন গানের মাধ্যমে - ‘আমাদের নিজেদের ভূমিকা কী?’ একজন শিল্পীর মুখে এই প্রশ্নই তাকে সময়ের চেয়ে এগিয়ে রাখে।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘দে ডোন্ট কেয়ার এবাউট আস’ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সাহসী গান ও মিউজিক ভিডিও হিসেবে বিবেচিত। এটি অনেক বেশি বিতর্কিত ছিল এই  কারণে যে,  এতে কু ক্লাক্স ক্ল্যান, লস অ্যাঞ্জেলেসের দাঙ্গা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃত ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছিল। গানটি প্রকাশের পর সমালোচিত হলেও পরবর্তীতে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনে এটি প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে নতুন মাত্রা লাভ করে।

কিন্তু গানটি প্রকাশের আগে যখন সংবাদমাধ্যমে এর লিরিক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, তখন মাইকেল জ্যাকসন ১৯৯৫ সালের ১৫ জুন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ একটি বিবৃতি পাঠান। সেখানে তিনি তার অবস্থান পরিষ্কার করে জানান যে, এই গানটি মূলত পক্ষপাতিত্ব, ঘৃণা ও সামাজিক অবিচারের ব্যথার কথা বলে। তিনি নিজেকে সব অত্যাচারিত ও অভিযুক্ত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

তার এই বক্তব্যটিই অবিনশ্বর। কারণ তিনি কোনো দল বা মতাদর্শের পক্ষে কথা বলেননি। তিনি কথা বলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বর্তমান পৃথিবীতে জলবায়ু ও মানব সভ্যতা যখন টিকে থাকার প্রচেষ্টায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মাইকেল জ্যাকসন লিখলেন ‘আর্থ সং’।

এই গান শুনলে মনে হয়, পৃথিবী নিজেই যেন মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। মানুষ বনভূমি ধ্বংস করছে, প্রাণী হত্যা করছে, যুদ্ধের আগুনে প্রকৃতি পুড়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি মানুষ উন্নয়নের নামে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখছে।

গানের কথাগুলো আজ ২০২৬ সালে আরও ভয়ংকরভাবে সত্য হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূল থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপাঞ্চল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যে বাস্তবতা তৈরি করেছে, তার পূর্বাভাস যেন অনেক আগেই শুনতে পেয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন।

আরও পড়ুন

×