ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

বাঁচার লড়াইয়ে সন্তানের জন্য মায়ের আত্মত্যাগ, ফুটবলার স্বামীর আবেগঘন পোস্ট

ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্প

বাঁচার লড়াইয়ে সন্তানের জন্য মায়ের আত্মত্যাগ, ফুটবলার স্বামীর আবেগঘন পোস্ট
×

আন্দ্রেয়া রুইজ বেলো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করে এক বছরের সন্তান আলানাকে বাঁচিয়েছেন (ছবি-বিবিসি)

বিবিসি

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ | ১১:১০ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ | ১১:৩২

ধ্বংসাবশেষের মধ্যে জীবনবাজি রেখে সর্বস্ব দিয়ে আগলে রেখেছেন সন্তানকে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের শরীর দিয়ে এক বছরের কন্যাসন্তানকে ধ্বংসস্তূপের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। মেয়ে আলানা’কে বাঁচাতে পেরেছেন ঠিকই, তবে এর বিনিময়ে সন্তানের জন্য চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করে গেছেন ভেনেজুয়েলার এক মা। সন্তানের প্রতি বীরত্বপূর্ণ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া এই নারীর নাম আন্দ্রেয়া রুইজ। তিনি দেশটির ফুটবলার হেক্টর বেলোর স্ত্রী। 

ভেনিজুয়েলার উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরার কুমানা শহরের একটি বহুতল ভবনে পরিবারসহ তারা বসবাস করতেন। বুধবার শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। এ সময় শিশুটিকে বিপদ থেকে আড়াল রাখেন মা। পরে ধ্বংসস্তূপের নিচে আন্দ্রেয়ার মরদেহ পাওয়া যায়। মায়ের এই চূড়ান্ত আত্মত্যাগের কারণে ধ্বংসস্তূপ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরে শিশু আলানা। তাকে রাজধানী কারাকাসের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। শিশুটি সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।  

ভেনিজুয়েলার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ইউনিভিশন আন্দ্রেয়া রুইজের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে। প্রতিবেদনে মা আন্দ্রেয়ার অনন্য আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করা হয়, যিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের শরীর দিয়ে এক বছরের কন্যাসন্তানকে ধ্বংসস্তূপের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।

এ ঘটনার পর ফুটবলার হেক্টর বেলো চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়েন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক পোস্টে তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে না পারা এবং পরিবারকে রক্ষা করতে না পারার গভীর অপরাধবোধ ও তীব্র মানসিক কষ্ট প্রকাশ পেয়েছে তার এসব পোস্টে। এমনকি ভবিষ্যতে বড় হওয়ার পর সন্তানকে তার মায়ের এই চিরতরে চলে যাওয়া এবং বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের কথা কীভাবে জানাবেন, তা নিয়েও তিনি চরম এক সংকটের মধ্যে রয়েছেন বলে জানান। তিনি এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার জন্য মানসিকভাবে শক্তি খুঁজছেন বলে জানিয়েছেন।

আন্দ্রেয়া রুইজের উদ্দেশে হেক্টর বেলো ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘তোমার মেয়েকে আমি কীভাবে বোঝাব যে, তুমি তার জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন হারিয়েছ, আর আমি সেখানে কিছুই করার জন্য উপস্থিত ছিলাম না? কীভাবে বোঝাব আমি? আমাকে এখন শক্তি দাও।’

মূল্যবান ভালোবাসা দিয়ে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় তাদের ছোট শিশুটির জীবন বাঁচিয়েছেন আন্দ্রেয়া রুইজ- এ কথা উল্লেখ করে হেক্টর বেলো তার ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন,‘বড় হয়ে আলানা জানতে পারবে কীভাবে তার মা নিজের জীবন দিয়ে তাকে বাঁচিয়েছে।’

ভেনেজুয়েলার ফুটবল ক্লাব মারিতিমো দে লা গুয়াইরার খেলোয়াড় হেক্টর বেলো পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি তাকে সেই গল্প শোনাব যে, তুমি কীভাবে তাকে বাঁচিয়েছ, কীভাবে তুমি আমাদের মেয়ের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছ, তুমি কেমন সাহসী নারী ছিলে যে, নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মুহূর্তেও তাকে ছেড়ে যাওনি।’

হেক্টর বেলো ধারাবাহিক পোস্টে জানিয়েছেন, তিনি কারাকাসে গিয়েছেন যেখানে তার মেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

শুক্রবার দিবাগত রাতে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমার মেয়ে এবং তার খালা ভালো আছে। তবে আজ তাদের হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হবে না। তারা হাসপাতালেই থাকছে।’

ভেনিজুয়েলার স্থানীয় ফুটবল গণমাধ্যম ও প্রচার সংস্থা কুমানা দে ক্যাম্পিওনেস ও আন্দ্রেয়া রুইজের মৃত্যু নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেছে। সংস্থাটি তাদের বিবৃতিতে লিখেছে, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, কুমানা শহরের বাসিন্দা ফুটবলার হেক্টর বেলোর স্ত্রীকে ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে পুরো পরিবার যে ভবনটিতে বসবাস করত, সেটি ধসে পড়লেও তাদের কন্যাসন্তান অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের স্প্যানিশ ভাষার সংবাদমাধ্যম ইউনিভিশনও ফুটবলার বেলোর স্ত্রীর মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ করেছে। গত বুধবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর থেকে আরও অনেকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে হেক্টর বেলোর একটি পোস্ট

ভেনিজুয়েলান ফুটবল ফেডারেশন এবং স্থানীয় ক্লাবগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুজন ফুটবল খেলোয়াড়ও রয়েছেন। কারাকাস ফুটবল ক্লাব জানিয়েছে, তাদের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের খেলোয়াড় রাজান সিজা লা গুয়াইরায় নিজের বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে মারা গেছেন। কারাকাস ফুটবল ক্লাব তাদের এই তরুণ প্রতিভার অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে লিখেছে, ‘তার আনন্দ, নিষ্ঠা এবং সাহচর্য এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের সাথে থাকবে।’

কারাকাসভিত্তিক ক্লাব স্পোর্ট সান অগুস্তিন তাদের ইনস্টাগ্রামে লিখেছে, ভিক্টর প্যালাসিওস তাদের একাডেমিতে একটি ‘অমোচনীয় দাগ’ রেখে গেছেন। তার চলে যাওয়ার এই বেদনা প্রকাশ করার মতো পর্যাপ্ত শব্দ আমাদের কাছে নেই।’

ভিক্টর প্যালাসিওসের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ভেনিজুয়েলান ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে যে, তিনি মারিতিমো দে লা গুয়াইরা ক্লাবের হয়েও খেলেছেন।

এদিকে সাবেক মিস ভেনিজুয়েলা গিজেল রেইস তার ইনস্টাগ্রামের এক পোস্টে জানিয়েছেন, জোড়া ভূমিকম্পের কারণে লা গুয়াইরায় তার মায়ের বহুতল ভবনটি ‘সম্পূর্ণ ধসে’ পড়ায় তার মা মারা গেছেন।

গিজেল রেইস জানিয়েছেন যে, ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনি এবং এর ভয়াবহ প্রভাবের কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মা মারা গেছেন। তার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নার্স, যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন, তিনিই এই দুঃখজনক খবরটি সবাইকে জানান। 

রাজধানী কারাকাসের কাছে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৯২০ জনের মৃত্যু এবং তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। উদ্ধারকারীরা বেঁচে থাকা মানুষদের খোঁজে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
 

আরও পড়ুন

×