খামেনির একটি শব্দে যেভাবে ইরানজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলো
তেহরানের সড়কে আলী ও মোজতবা খামেনির ছবি সংবলিত বিলবোর্ড। ছবি: এএফপি
দ্য টেলিগ্রাফ
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৩৬ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৫১
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বলা একটি শব্দ দেশটির ঐক্যে যতটা ফটল ধরিয়েছে, তা ৪০ দিনের যুদ্ধও করতে পারেনি। বিতর্ক তৈরি করা সেই শব্দটি হলো ‘আলাল-উসুল’। যার অর্থ- ‘নীতিগতভাবে’।
যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক চুক্তি বা সমঝোতাকে অনুমোদন দেওয়ার ফার্সি ভাষার একটি বিবৃতিতে মোজতবা এই শব্দটি ব্যবহার করেন। চুক্তি অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তিনি এই চুক্তি চাননি। বলেন, ‘নীতিগতভাবে, আমার ভিন্ন মত ছিল।’
দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও শব্দটির রেশ এখনো তেহরানের ক্ষমতা চর্চার কেন্দ্র, গণমাধ্যম ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই শব্দটি ইরানকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেটি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি করা আদৌ উচিত কি না?
শব্দটির নানা ব্যাখ্যা
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান এমন এক শাসনব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা থাকে একজন সর্বোচ্চ নেতার হাতে। তবে সমঝোতা স্মারকের অনুমোদনে মোজতবার ওই শব্দের ব্যবহার অস্পষ্টতা তৈরি করেছে। ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠী এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে।
এক পক্ষের মতে, এই শব্দটি ইঙ্গিত দেয়- মোজতবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি দিয়েছেন। তাঁর মতো সংশয়বাদী নেতা ভেঙে পড়া অর্থনীতি, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন করে যুদ্ধের হুমকি এড়ানোর পথ হিসেবে কূটনীতিকে বেছে নিয়েছেন।
অন্য পক্ষের মতে, সর্বোচ্চ নেতার বিবৃতিতে ‘ভিন্ন মত’ উল্লেখ থাকাটা চুক্তি প্রতিহতের সবুজ সংকেতকে ইঙ্গিত করে। এই পক্ষের সমর্থকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা একটি ফাঁদ। আলী খামেনিকে হত্যাকারী শত্রুদের কখনোই বিশ্বাস করা যায় না। নতুন কোনো ছাড় দেওয়ার ফাঁদে না পড়ে ইরানের উচিত এই আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসা।

তেহরান থেকে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, বিবৃতির ওই একটি শব্দ বর্তমানে শাসনব্যবস্থার ভেতরে সংকট তৈরি করেছে। এটি কমান্ডারদের, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা কর্মকর্তাদের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে। তারা ভাবছেন মোজতবা এই আলোচনায় খুশি নন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সন্দেহ বেড়েছে
পার্লামেন্টে কট্টরপন্থীদের আধিক্যের কারণে এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। তেহরানের ওই কর্মকর্তা সন্দেহের উদাহরণ হিসেবে কট্টরপন্থী আলেম ও এমপি মাহমুদ নাবাবিয়ানের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
সম্প্রতি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে খামেনির কিছু গোপন চিঠি পড়ে শোনান নবাবিয়ান। তিনি দাবি করেন, চিঠিগুলো প্রমাণ করে চুক্তির আলোচনাকারীরা সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন।
নাবাবিয়ান এমন দাবি করার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একজন পরিচালক পদত্যাগ করেন। তেহরানের ওই কর্মকর্তা বলেন, সাক্ষাৎকারে নবাবিয়ান যা বলেছেন তা সন্দেহের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপাতত সবকিছুকেই বড় ধরনের সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
এই সন্দেহের দোলাচল রণক্ষেত্রেও পৌঁছে গেছে। সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে দায়িত্বরত আইআরজিসির এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এই প্রণালি দিয়ে কারা পার হবে তা আমরা ঠিক করব। এ দায়িত্ব তেহরানের এসি রুমে বসে থাকা কেউ কিংবা ওয়াশিংটনের কোনো কর্মকর্তার নয়। আমরা এখানে আছি এবং আমরাই ঠিক করব কে আসবে আর কে যাবে।’
তেহরান থেকে দ্বিতীয় আরেক কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেছেন, শব্দটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পুরো বিষয়কে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি নীরবে যুদ্ধের প্রস্তুতি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে আছে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা।
এদিকে মোজতবার বিবৃতির একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁর শ্বশুর ও সাবেক স্পিকার গোলাম-আলি হাদ্দাদ-আদেল। গত সোমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, মোজতবা দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই ঐক্যের কথা বলে আসছেন। তাই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে দেশকে বিভক্ত করবেন- এটা ভাবা যায় না।
আদেলের মতে, এই বার্তাটিকে একটি লাইনে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্পূর্ণভাবে পড়তে হবে। ‘আলাল-উসুল’ শব্দের ভুল ব্যাখ্যাই বিভেদের কারণ হয়েছে। মোজতবা চুক্তিকে নস্যাৎ করা তো দূরের কথা, তিনি বরং ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ইরানি আলোচকদের হাত শক্তিশালী করছেন।
রাজনৈতিক কৌশল
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিবৃতিতে এমন শব্দের ব্যবহার এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশলকে ইঙ্গিত করে। মোজতবার বাবা আলি খামেনিও এমন কৌশল অবলম্বন করতেন। মোজতবা সম্ভবত চুক্তির দায় নিজের কাঁধে নিতে চাননি। তাই তিনি বিবৃতিতে নিজের অবস্থান এমনভাবে তুলে ধরেছেন যা সব অবস্থাতেই তাঁর জয় নিশ্চিত করে।
চুক্তিটি সফল হলে অনুমোদনকারী হিসেবে মোজতবা নিজেও কৃতিত্ব পাবেন। আর যদি ভেস্তে যায়, তবে তিনি নিজের ‘ভিন্ন মত’ থাকার দোহাই দিতে পারবেন। তখন সব ব্যর্থতার দায় বর্তাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ওপর।
আলী খামেনি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময়ও ঠিক এমন কাজ করেছিলেন। তিনি প্রথমে একটি রেড লাইন বা সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সরকারের করা চুক্তিটি যখন ব্যর্থ হয়, তখন আলী খামেনি সেটির দায় নিতে চাননি।
তেহরানের একজন বিশ্লেষক টেলিগ্রাফকে বলেন, অন্তত সাতটি গোষ্ঠী মোজতবার বিবৃতির মূল বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা তৈরি করছেন। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আছে কট্টরপন্থীরা। তারা চুক্তির আলোচনাকারীদের দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। অপরদিকে আছে সরকারপন্থী গণমাধ্যম। তারা সমঝোতাকে প্রচার করছে জাতীয় বিজয় হিসেবে।
সাতটি গোষ্ঠীর মধ্যে একাংশ আবার মনে করছে, মোজতবার উল্লেখ করা ওই শব্দের হয়তো বিশেষ বা গভীর কোনো অর্থই নেই।
(বুধবার দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত দীর্ঘ প্রতিবেদন থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ)
- বিষয় :
- মোজতবা খামেনি
- ইরান
- রাজনীতি
- বিরোধ
- সমঝোতা স্মারক
