ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ইরান পরমাণুমুক্ত হলে যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী ছিল

দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান ইতোমধ্যে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত

ইরান পরমাণুমুক্ত হলে যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী ছিল
×

ছবি: সিএনএন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ২৩:০৩

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলা শুরুর আগে দাবি করেছিলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বিশ্বের জন্য এক আসন্ন হুমকি। দীর্ঘ চার মাস ধরে যুদ্ধ চলার পর ট্রাম্প হঠাৎ সম্পূর্ণ উল্টো সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। আঙ্কারায় ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বারবার দাবি করেছেন, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে এক বিরাট সফল, কারণ ইরানকে সম্পূর্ণ পরমাণুমুক্ত করা গেছে। 

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পরমাণু সামগ্রী এখন মাটির এত গভীরে বা পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছে, সেগুলো উদ্ধার করা কার্যত অসম্ভব। মার্কিন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ওই সব এলাকায় কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে, যার ফলে ইরানের পক্ষে কখনোই আর পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। এমনকি এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, পরোক্ষভাবে ইরানের পরমাণু সামগ্রী এখন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং আমেরিকা ছাড়া আর কেউ সেখানে পৌঁছাতে পারবে না। 

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই দাবিগুলোর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই এবং এগুলো সম্পূর্ণ স্ববিরোধী। যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটির পরমাণু অস্ত্র তৈরির ন্যূনতম সক্ষমতাও আর অবশিষ্ট নেই। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর গত ফেব্রুয়ারিতে আবার কোন আসন্ন হুমকির কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্যই ছিল ইরানের পরমাণু সামগ্রী মার্কিন হেফাজতে নেওয়া এবং তেহরানকে একটি কঠোর স্থায়ী চুক্তিতে বাধ্য করা, যাতে তারা ভবিষ্যতে কখনও পরমাণু অস্ত্র বানাতে না পারে। গত ৭ এপ্রিল প্রথম যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে বিগত তিন মাস ধরে মার্কিন প্রশাসন একটি পরমাণু চুক্তির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। যদি মাটির নিচে পরমাণু সামগ্রী চাপা পড়াই যথেষ্ট হতো এবং ইরান ইতোমধ্যেই পরমাণুমুক্ত হয়ে থাকত, তবে গত তিন মাস ধরে কেন এই চুক্তির পেছনে ওয়াশিংটন সময় ও অর্থ নষ্ট করল? ট্রাম্পের এই স্ববিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করে, যুদ্ধের শুরু এবং এর ধারাবাহিকতা– সবই ছিল এক মিথ্যা অজুহাতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। 

ব্যর্থতা ঢাকতেই কি এই নতুন চাল? 
প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ইরানের সঙ্গে কোনো ভালো চুক্তি করা ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তিনি এখন এই যুদ্ধের পেছনে নিজের ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন এবং তিনি বুঝতে পেরেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে মার্কিন জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থান আরও ধসে পড়বে। 

তাই কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন বা পরমাণু চুক্তি ছাড়াই যুদ্ধ থেকে নিজেদের সম্মানজনকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য তিনি এখন থেকেই মাঠ তৈরি করছেন। তিনি মার্কিন জনগণকে বোঝাতে চাচ্ছেন, আমেরিকা যুদ্ধে জিতে গেছে এবং যে উদ্দেশ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা অর্জিত হয়েছে। 

যুদ্ধের পরিণতি শুধু ক্ষতিই সার 
ট্রাম্প তাঁর এই সামরিক অভিযানকে বিরাট সাফল্য বলে প্রচার করলেও, এই যুদ্ধের আসল ফল কিন্তু বিশ্বের জন্য খুবই ভয়াবহ ও ক্ষতিকর হয়েছে। এই অর্থহীন সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এক তীব্র ধাক্কা ও মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে। 

এর চেয়েও বড় ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয় হলো, এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরান বিশ্বমঞ্চে নিজের শক্তির জানান দিয়েছে। তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা আগে কখনোই এতটা স্পষ্ট ছিল না। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই একক আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্য তথা গোটা বিশ্বের তেল বাণিজ্যের জন্য একটি বিশাল দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ হয়নি। উল্টো এটি বিশ্বকে এক চরম অর্থনৈতিক ও সামরিক অনিরাপত্তার মুখে ফেলে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

×