এক্সপ্লেইনার
ইরানে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে?
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার নাম ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’। বাংলাদেশ সময় গত সোমবার রাতে এই অভিযানের ঘোষণা দেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজ। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচল, বিমান চলাচল, স্বর্ণ, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সম্পদ খাতের ওপরও পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা বলতে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশের সঙ্গে তৃতীয় পক্ষ বা অংশীদারদের কার্যক্রম বন্ধের চাপ সৃষ্টি করাকে বোঝায়। ইরানের বিরুদ্ধে এর আগেও এমন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেটি ছিল পারমাণবিক কর্মসূচিকেন্দ্রিক। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানের ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করতে বলেছিল ওয়াশিংটন।
নতুন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যেসব অর্থনৈতিক পথ ইরানের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়াই অভিযানের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে তেহরানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। সোমবার রাতের সংবাদ সম্মেলনে বেসেন্ট আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের ফোন করে ইরানের সঙ্গে লেনদেন না করার অনুরোধ জানাচ্ছেন। তবে বেসেন্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি।
অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্টের প্রেক্ষাপটে তেহরানের সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্যের প্রসঙ্গটিও সামনে আসছে।
বাংলাদেশ-ইরানের বাণিজ্য
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান প্রকাশকারী একটি প্রতিষ্ঠান হলো ‘ট্রেড ডেটা মনিটর’ বা টিডিএম। তাদের তথ্য থেকে ইরানের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সম্পর্কে জানা যায়। প্রতিষ্ঠানটি ছয়টি মহাদেশের সরকার, করপোরেশন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আইন সংস্থা ও সংগঠনকে তথ্য সরবরাহ করে। তবে টিডিএমের পরিসংখ্যানে অনিবন্ধিত বাণিজ্যের তথ্য থাকে না। ইরান তেল রপ্তানির বড় একটি অংশই অনিবন্ধিত মাধ্যমে করে থাকে।
গতকাল মঙ্গলবার টিডিএমের বরাত দিয়ে ইরানের বাণিজ্য অংশীদারদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে আলজাজিরা। তাতে আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৭তম দেখানো হয়েছে। ২০২৪ সালে ইরানে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৩৬ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলারের (তিন কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার) পণ্য। আর বাংলাদেশ ইরান থেকে আমদানি করেছে প্রায় ১১১ দশমিক ১১ মিলিয়ন বা ১১ কোটি ১১ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান পাওয়া যায় বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ওয়েবসাইটে। এ সময়ে বাংলাদেশ ইরানে রপ্তানি করেছে ৮২ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৪ ডলারের পণ্য।
ইরান কোন ধরনের পণ্য বাংলাদেশ থেকে বেশি নেয়, তার তথ্য পাওয়া যায় আর্থিক বাজারের ডেটা সরবরাহকারী আরেক প্রতিষ্ঠান ‘ট্রেডিং ইকোনমিক্সের’ ওয়েবসাইটে। তবে এই তথ্য ২০২২ সালের। ওই সময় বাংলাদেশ থেকে ইরানের আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বা তিন কোটি ৮৩ লাখ ডলার। এর শীর্ষে ছিল উদ্ভিজ্জ টেক্সটাইল ফাইবার, কাগজের সুতা ও বোনা কাপড়।
একই বছর বাংলাদেশ ইরান থেকে আমদানি করেছিল ১১০ দশমিক ১২ মিলিয়ন বা প্রায় ১১ কোটি ডলারের পণ্য। সবচেয়ে বেশি আমদানি করেছিল জীবাশ্ম জ্বালানি ও তেল। অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে ছিল– লবণ, সালফার, পাথর, সিমেন্ট, ফল, বাদাম, প্লাস্টিকস, রাবার ও সার।
‘ত্যাগ স্বীকারে রাজি’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মাথায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাঁচটি বন্ধুরাষ্ট্রের জন্য জলপথ খোলা রাখার কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের নামও ছিল।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন যখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দেয়, তখন ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান মোহসেন রেজাই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞায় যারা সহযোগিতা করবে, তারা শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হবে।’ অর্থাৎ, যারা তেহরানের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করবে, তারা শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
ফলে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ওয়াশিংটনের পাশাপাশি তেহরানের বন্ধুরাষ্ট্রের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ অবস্থায় বাণিজ্যের আকারের ওপর জোর দিচ্ছেন তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বেশি নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বড় রপ্তানি বাজার। এই স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করতে হতে পারে।
‘যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সম্পর্ক ছিন্ন করা’
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’। এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী র্যাচেল জিয়েম্বা আলজাজিরাকে বলেছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত আগের ব্যবস্থারই সম্প্রসারণ। তবে এর একটি উদ্দেশ্য হলো, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা বাকি অংশীদারদের ভয় দেখিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করা।
র্যাচেল বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান অস্পষ্টভাবে পরিচালিত বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অন্য দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে হুমকি ও কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
‘ইরানের শীর্ষ রপ্তানি অংশীদার কারা?’
গত দুই দশকের বড় একটি সময়জুড়ে ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের অর্থনীতি এশিয়া ও আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে।
সরকারি শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান অন্তত ১১২টি দেশ ও অঞ্চলে ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তাদের শীর্ষ রপ্তানি অংশীদারদের মধ্যে শুরুতেই আছে চীন। তারা ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। সমুদ্রপথে রপ্তানি করা অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে বেইজিং। এর বড় অংশই গোপনে চলাচলকারী জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন ও ছাড়মূল্যে বিক্রি হয়।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে ইরানের রপ্তানি বাণিজ্যের আকার প্রায় ১৪ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। এর পর আছে ইরাক। তাদের সঙ্গে রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। শীর্ষ পাঁচে থাকা বাকি দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ৭.১৬, তুরস্কের সঙ্গে ৬.১ এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যের আকার ২.৩ বিলিয়ন ডলার।
‘শীর্ষ আমদানি অংশীদার কারা?’
২০২৪ সালে ইরান অন্তত ৮৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে পণ্য আমদানি করেছে। এর আর্থিক আকার প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। মোট আমদানির ৩০ শতাংশ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে– প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার। তবে সেগুলো আমিরাতে উৎপাদিত নয়, বরং পুনঃরপ্তানি করা পণ্য। এর মাধ্যমে তেহরান পরোক্ষভাবে পশ্চিমা যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও ভোগ্যপণ্যে প্রবেশাধিকার পেত। কিন্তু আবুধাবির জারি করা অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞায় সে পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
শীর্ষ পাঁচে এর পর আছে চীন (১৭.৮ বিলিয়ন ডলার)। সেখান থেকে মূলত যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, যানবাহন ও শিল্প খাতের সামগ্রী আমদানি করা হয়। পশ্চিমাদের সঙ্গে বাণিজ্যের পথ সংকুচিত হওয়ার পর তেহরান বেইজিংয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আমদানি পণ্যের আর্থিক আকার বিবেচনায় এর পর আছে তুরস্ক (১১.১), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (৬.১) ও ভারত (১.৬ বিলিয়ন ডলার)।