মৃত্যুর মুখ থেকে যেভাবে বেঁচে ফিরলেন তারা
বেঁচে ফেরা এসব মানুষের মুখে এখনো সেই ভয়াবহ সকালের স্মৃতি। ছবি - দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট
দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৪৬ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৪৯
নেপালের রাশুয়া জেলার ভোতেকোশি নদীতে হঠাৎ নেমে আসা ভয়াবহ বন্যায় মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় জনপদ। কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত ভাসিয়ে নেয় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও সড়ক। প্রাণ বাঁচাতে কেউ ছুটেছেন পাহাড়ের ঢালে, কেউ জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ আবার পেছনে ধেয়ে আসা বন্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালিয়েছেন।
বেঁচে ফেরা এসব মানুষের মুখে এখনো সেই ভয়াবহ সকালের স্মৃতি। কারও স্বজন নিখোঁজ, কারও চোখের সামনে ধ্বংস হয়েছে পুরো বসতি।
‘বিদ্যুতের তার আঁকড়ে বেঁচে ফিরেছি’
রাউতাহাটের রাজদেবী পৌরসভার বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী রামবচন সাহ ত্রিশূলি বাজারের একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন। বুধবার সকালে দোকানে কাজ করার সময় হঠাৎ বন্যার স্রোতে ভেসে যান তিনি। বাঁচার জন্য একটি বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরেন। প্রায় আধা ঘণ্টা সেই তারে ঝুলে থাকার পর প্রাণে বাঁচেন।

রামবচন বলেন, ‘হাত যদি তার থেকে ফসকে যেত, তাহলে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না।’ তবে তিনি বেঁচে গেলেও ওই দোকানের তিনজন-সংগীতা, তার ছেলে রাহুল ও কর্মী বিনোদ ভগত-এখনো নিখোঁজ।
‘জঙ্গলে দৌড়ে যাওয়াই আমাকে বাঁচিয়েছে’
রামেছাপের রাজু বুধাথোকি তখন তিমুরেতে ছিলেন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে হঠাৎ পাহাড় কাঁপতে শুরু করলে তিনি ভূমিকম্প হয়েছে ভেবে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দেন।

পুলিশ ফাঁড়ির দিকে যাওয়ার সময় দেখেন, পুলিশ সদস্যরাও পালাচ্ছেন। পেছনে তাকিয়ে দেখেন, একের পর এক ঘর ভেঙে ত্রিশূলি নদীতে পড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বসতি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার ওপরে জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি। রাজু বলেন, ‘ভাবার মতো সময় ছিল না। জীবন বাঁচাতে বাইরে দৌড়ে যাই।’
‘এখনো মনে হয়, আমি যেন স্বপ্ন দেখছি’
সাল্যানের ৪০ বছর বয়সী গোঠে কামি তখন রাশুয়ার মাইলুংয়ে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে কাজ করছিলেন। পাহাড় থেকে পাথর ভেঙে পড়ার মতো শব্দ শুনে তিনি ভোতেকোশি নদীর পানি ধেয়ে আসতে দেখেন।
_1787996288.jpg)
কামি সবাইকে দৌড়াতে বলেন এবং নিজেও জঙ্গলের দিকে ছুটে যান। কিছু সময়ের জন্য জ্ঞান হারানোর পর জ্ঞান ফিরে দেখেন, নিচের পুরো বসতি মাটি ও পানির নিচে চাপা পড়েছে। ‘শুধু তখনই বুঝলাম, আমি বেঁচে গেছি,’ বলেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এখনো মনে হয়, আমি যেন স্বপ্ন দেখছি।’
‘নতুন জীবন নিয়ে ফিরেছি’
কাঠমান্ডুর গোকর্ণেশ্বরের প্রকাশ গৌতমও ছিলেন তিমুরেতে। হঠাৎ বিকট শব্দে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলে প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দেন তিনি। পালানোর সময় বাঁ পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে আঘাত পান।

পরে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে দেখেন, বন্যার পানিতে মরদেহ ভেসে যাচ্ছে। আরও কয়েকজনের সঙ্গে জঙ্গলে রাত কাটানোর পর বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তাদের বিদুরে নেওয়া হয়। প্রকাশ বলেন, ‘হেলিকপ্টারে ওঠার পরই মনে হলো, এবার হয়তো বেঁচে যাব। আমি যেন নতুন জীবন নিয়ে ফিরেছি।’
যে ঢেউ তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে সরিয়ে দিল
দোলখার তুলসী বাহাদুর ভান্ডারীও বেঁচে গেছেন এক অপ্রত্যাশিত কারণে। রাশুয়ার একটি বসতিতে কালো কাদা ও পানির স্রোত ছুটে আসার সময় একটি শক্তিশালী ঢেউ তাকে পাহাড়ের দিকে ছিটকে দেয়।

হাসপাতালের বিছানায় ভান্ডারী বলেন, ‘ঢেউটা আমাকে জোরে আঘাত করে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়।’ সেই ধাক্কাই শেষ পর্যন্ত তার জীবন বাঁচায়।
‘ওই ঢেউ যদি আমাকে পাহাড়ের দিকে ছুড়ে না দিত, তাহলে আজ আমি বেঁচে থাকতাম না। ঢেউটা আমাকে পাশের দিকে সরিয়ে দেওয়ায় আমি স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে বেঁচে যাই,’ বলেন তিনি।
‘বেঁচে গেলেও মামার পুরো পরিবারকে হারিয়েছি’
ঝাপার শচীন খাতি বন্যার সময় বসতিতে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। তবে তার মামা রাজকুমার দিয়ালি, মামি শৃতি ও তাদের চার বছরের ছেলে শ্রীরাজ এখনো নিখোঁজ।
বুধবার সকালে কাজের জন্য শচীনকে চিলিমে পাঠিয়েছিলেন রাজকুমার। বন্যার খবর পেয়ে ফিরে এসে শচীন দেখেন, তাদের পুরো বসতি ভেসে গেছে।
‘বন্যার খবর শুনে দ্রুত ফিরে আসি। কিন্তু ততক্ষণে আমরা যেখানে থাকতাম, সেই পুরো গ্রামই ভেসে গেছে,’ বলেন তিনি।
রাজকুমারের ভাতিজি রাধা খাতি বলেন, ‘তাদের জীবিত না পেলেও অন্তত মরদেহগুলো যেন পাওয়া যায়। পুরো পরিবার তাদের অপেক্ষায় আছে।’ ঝাপা জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাশুয়ায় থাকা জেলার ১৩ জনের সঙ্গে বন্যার পর থেকে পরিবারের যোগাযোগ নেই।
বেঁচে ফিরেও আতঙ্ক কাটেনি
ভোতেকোশির বন্যা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষগুলোর গল্প আলাদা হলেও তাদের অভিজ্ঞতার ভয়াবহতা একই। কেউ বিদ্যুতের তার আঁকড়ে, কেউ জঙ্গলে ছুটে, কেউ গাড়ি চালিয়ে, আবার কেউ স্রোতের ধাক্কায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন।
তবে বেঁচে ফেরার স্বস্তির সঙ্গে তাদের মনে রয়েছে স্বজন হারানোর শোক ও সেই সকালের ভয়াবহ স্মৃতি। তাদের অনেকের চোখে এখনো ভাসছে মুহূর্তের মধ্যে একটি জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য।