নেপালে বিপর্যয়
খাবার, ওষুধ ও পানির সংকটে দুর্গতরা
৭৯৭ মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ৩০০০
প্রলয়ঙ্করী বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও সেখানে জরুরি ওষুধ, খাবার ও সুপেয় পানির ঘাটতি পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলছে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৫ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০০
বন্যা থেকে বেঁচে ফেরাটা রেখা দেবী গোঁসাইয়ের জন্য ছিল প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। ত্রিশূলী বাজারের এই বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডে ভুগছেন। বানের তোড়ে তাঁর বাড়িঘর ও চারটি দোকান ভেসে গেছে। জীবন বাঁচিয়ে বের হতে পারলেও সঙ্গে নিতে পারেননি জরুরি ওষুধপত্র। এখন পরিবারের সঙ্গে একটি আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই হয়েছে। কিন্তু পাশের ত্রিশূলী হাসপাতালে কোনো ওষুধ নেই। রেখা দেবীর ছেলে রঘুবীর জানান, তিন দিন ধরে তাঁর মা একটা ওষুধও পাননি।
কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্দশা কেবল ওষুধেই আটকে নেই। আশ্রয়শিবিরে তাদের এক স্বজনের প্রসব বেদনা উঠলে অনেক আবেদনের পর গত শনিবার হেলিকপ্টারে তাঁকে কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়। স্থানীয় হাসপাতালে তাঁকে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না; আবার রাজধানীর সঙ্গে সড়কপথও বিচ্ছিন্ন। এই অভিজ্ঞতা শুধু রেখা দেবীর পরিবারের নয়; প্রলয়ঙ্করী বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও আশ্রয়শিবিরগুলোয় শুরু হয়েছে বেঁচে থাকার দ্বিতীয় অগ্নিপরীক্ষা। সেখানে জরুরি ওষুধ, খাবার ও সুপেয় পানির ঘাটতি প্রতিমুহূর্তে পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলছে।
অন্য একটি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন কপিলা পারিয়ার। তাঁর ৬২ বছর বয়সী মা হাঁপানির তীব্র সমস্যায় ভুগছেন। কপিলা জানান, তাঁর মায়ের দুই-তিনটি ওষুধ খুব প্রয়োজন। কিন্তু কোনো ওষুধই তারা সংগ্রহ করতে পারছেন না। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের কোনোভাবেই ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু ত্রিশূলী হাসপাতালে ওষুধের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানান, উচ্চ রক্তচাপের জন্য সচরাচর দেওয়া অ্যাটেনোলল ও লোসার্টনের মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ তাদের মজুতে নেই। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় হাসপাতালের স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচিও অচল হয়ে পড়েছে। তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা বলেন, শিবিরের বহু রোগীর নিয়মিত ওষুধ দরকার হলেও তাদের কিছু দেওয়া যাচ্ছে না।
সুপেয় পানির ঘাটতি ও মহামারির আশঙ্কা
একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির অভাব। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্যানেল এবং টুপচে দিয়ে আসা পানির পাইপলাইন ধসে যাওয়ায় হাসপাতাল ও সংলগ্ন এলাকায় পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশের বাগটার এলাকায় ভৈরুং মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কভার্ড হল ও বেথান একাডেমির তিনটি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। সুপেয় পানির ঘাটতি ও শৌচাগারের অব্যবস্থাপনার কারণে শিবিরের উপচে পড়া পরিবেশে কলেরা বা ডায়রিয়ার মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট রাজেন্দ্র লামা।
এ ছাড়া আশ্রয়শিবিরে খাবারের তীব্র হাহাকার দেখা দিয়েছে। দুর্গতরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, শিবিরে যে খাবার দেওয়া হচ্ছে, তা একেবারেই অপ্রতুল। খাবারে ন্যূনতম পুষ্টিও নেই। অন্তঃসত্ত্বা নারী, প্রসূতি ও জটিল রোগীদের জন্য এই খাবার চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্যান্য শিবিরে থাকা মানুষরা জানান, হাতে টাকা নেই, পরনে বাড়তি কাপড় নেই, এমনকি কোলানি বাজারে কেনার মতো কোনো জিনিসও অবশিষ্ট নেই। দুর্গত পরিবারগুলোর সামনে এখন অনাহার ও অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই।
নিখোঁজ তিন হাজার ছাড়াল, বাড়ছে মৃতের সংখ্যা
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। রোববার নেপাল সরকার ও তিব্বত প্রশাসনের দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৪৮-এ। এখন পর্যন্ত দুই দেশে ৭৯৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে ৫৯২ বিদেশি নাগরিকসহ দুই হাজার ৫০২ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। গতকাল দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮১-তে পৌঁছেছে।
চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশের সুযোগ না থাকায় সেখানে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ চিত্র পাওয়া কঠিন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি গতকাল জানিয়েছে, তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জন নিহত হয়েছেন এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৩ দেশের ২৬১ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে ১০৪ জন নেপালি, ৪৯ ভারতীয়, ৩৩ লাটভিয়ান, ১৮ মার্কিনি ও ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক।
দেশটির সামাজিক মাধ্যম থেকে দুর্যোগের ছবি ও ভিডিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চীনের জলসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্তসংলগ্ন কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি স্বাভাবিকভাবে নেমে যাওয়ায় নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। তবুও নদীগুলোর পানি নতুন করে বাড়তে থাকায় শঙ্কা কাটেনি।
সুড়ঙ্গে আটক শ্রমিকদের উদ্ধারে তল্লাশি
হিমালয় পাদদেশের আপার ত্রিশূলী ৩এ ও ৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাদায় ভরা সুড়ঙ্গে আটক শত শত শ্রমিককে উদ্ধারে সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৯৩৪ জন জলবিদ্যুৎ শ্রমিক নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন। নেপালি সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা ভারী ড্রিলিং মেশিন, হাইড্রোলিক কাটার ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১৮০ মিটার গভীরে প্রবেশ করে সুড়ঙ্গের ওপরের অংশ উন্মুক্ত করেছেন। তবে সুড়ঙ্গে রশি বেয়ে নেমে ডাকাডাকি করা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সামরিক হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৩৫ জন এবং পুলিশের তথ্যমতে প্রায় ২০০ শ্রমিক সেখানে আটকে থাকতে পারেন। এই অভিযানে নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দলও যোগ দিয়েছে।
এদিকে, দক্ষিণ নেপালের ভারতপুর ও পোখরা এলাকার হাসপাতালগুলোয় স্বজনরা এলইডি স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মরদেহের ছবির দিকে তাকিয়ে প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরছেন। বহু মরদেহ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় প্রিয়জনকে শনাক্ত করার একমাত্র চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে কানের দুল, গলার চেইন, স্কুলের টাই কিংবা শরীরের ট্যাটু।