ইরান যুদ্ধে বেসামরিক প্রাণহানিতে বাড়ছে উদ্বেগ
ছবি: রয়টার্স
রয়টার্স
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৪৪
ইরানের ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ১৮ জন নিহত হওয়ার খবরের পর সংঘাতের ফলে বেসামরিক প্রাণহানি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চারজন রয়েছেন। ওই ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে দেশজুড়ে চালানো মার্কিন হামলায় ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর উপকূলের কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চারজন নিহত ও ৬৭ জন আহত হয়েছেন।
সংঘাতপূর্ণ কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় পুরো অঞ্চলের দেশগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। ইরান বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে কুয়েতের সেনাবাহিনী আরও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছে এবং বলেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলো প্রতিহত করা হয়েছে।
জুলাই মাসে সর্বশেষ সংঘাতের পর থেকে পরিস্থিতি মূলত শান্তই ছিল। তবে এর মধ্যবর্তী সময়ে শান্তি আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বড় ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজ দেশে যুদ্ধটি অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগীরা সংঘাত সীমিত রাখার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে অবগত চারজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ইরানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আঘাত হানার খবরও রয়েছে। তাঁর মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানিয়েছেন, গুতেরেস অবিলম্বে সামরিক তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
ডুজারিক বলেন, মহাসচিব বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সব ধরনের হামলার নিন্দা জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, সব পক্ষকেই আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে পার্থক্যকরণ, আনুপাতিকতা এবং সতর্কতামূলক পদক্ষেপের নীতিও রয়েছে।
ইরানের স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (এইচআরএএনএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জনের মৃত্যুর হিসাব নথিভুক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার নিহতরা ওই হিসাবের অতিরিক্ত।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক ইমেইলে বলেছেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো সম্পর্কে তারা অবগত। আইআরজিসির বিপরীতে মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না।
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে একটি ভবনের ছাদে বড় গর্ত এবং এর পাশে মাটিতে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশাপাশি কিছু স্থিরচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কাছে লোকজনকে এবং মাটিতে পড়ে থাকা একটি ইউটিলিটি টাওয়ার দেখা যায়।
রয়টার্স স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে ঘটনাস্থলটি যাচাই করতে সক্ষম হয়েছে। এতে দেখা যায়, পড়ে যাওয়া টাওয়ারটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে ১৩৬ মিটার দূরে ছিল।
বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘটা এই ঘটনা মিনাবের একটি স্কুলে হওয়া সেই বিস্ফোরণের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে যুদ্ধের প্রথম দিনেই একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৬০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
মিনাব হামলার বিষয়ে পেন্টাগন এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে বেসামরিক প্রাণহানির সবচেয়ে বড় ঘটনা হতে পারত এটি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো বা সেকেলে তথ্য ব্যবহারের কারণে এমনটা ঘটে থাকতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আইনপ্রণেতাদের কাছে এখনও সেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমর্থকেরা বেসামরিক মৃত্যুর আরেকটি কারণ হিসেবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে ইরানের দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করেন। ওই ঘটনা ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরান আক্রমণের আগের। এইচআরএএনএ-এর মতে, ওই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি। তবে বিদেশে অবস্থানরত ইরানি গোষ্ঠীগুলোর দাবি, সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো বিদেশি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া সহায়তা বন্ধ করার পাশাপাশি ট্রাম্প এই যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে ইরানিদের নিজেদের সরকার উৎখাতের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।
ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী যেকোনো তেল ট্যাঙ্কারকে হুমকি দিয়েছে। এর ফলে এই জলপথে চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
- বিষয় :
- মার্কিন হামলা
- ইরান
- নিহত
- আহত
- ড্রোন হামলা
- ক্ষেপণাস্ত্র