ঢাকা শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হরমুজে সংকট, বাব আল-মান্দাবে হুতিদের চাপ—বিশ্ববাজারে তেল পৌঁছাবে কীভাবে?

হরমুজে সংকট, বাব আল-মান্দাবে হুতিদের চাপ—বিশ্ববাজারে তেল পৌঁছাবে কীভাবে?
×

ওমানের কাছাকাছি সমুদ্রপথ দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছে মার্কিন নৌবাহিনী। ছবি: সংগৃহীত

গালফ নিউজ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:০৭ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:০৮

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক মাস ধরেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত সংকুচিত হয়ে আছে। এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ-লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব আল-মান্দাব প্রণালিও হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

ইরানের বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা এবং লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানির পথ।

কিন্তু ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা সেই বিকল্প পথেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে গড়ে মাত্র ১৯টিতে। বৃহস্পতিবার জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, ওই দিন মাত্র ৯টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।

ওমানের কাছাকাছি সমুদ্রপথ দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছে মার্কিন নৌবাহিনী। তবে এ পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। জুলাই ও আগস্টে ওমানের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।

ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলে অভ্যস্ত জাহাজ মালিকদের অনেকেই এখন ওই পথে যেতে অনাগ্রহী।

এর প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিতেও। বিশ্লেষক মিশেল ভিসে বকমানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আগস্টে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।

সৌদির বিকল্প পথও চাপে

হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের একটি বড় সুবিধা হলো-দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে তেল লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে নেওয়া যায়।

ইরান হরমুজে চলাচল সীমিত করার পর এই পথের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। লোহিত সাগরের বন্দর থেকে জাহাজ দক্ষিণে বাব আল-মান্দাব হয়ে এশিয়ায় যেতে পারে। আবার উত্তর দিকে গিয়ে সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরেও পৌঁছানো যায়।

কিন্তু এখন বাব আল-মান্দাব নিয়েই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে হুতিরা। ইয়েমেন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ পেরিমও দখল করেছে। এর ফলে প্রণালিটির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দাব পেরিয়ে মাত্র দুটি সৌদি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে।

পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও বন্ধ

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাইপলাইনটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

ফলে হরমুজ এড়িয়ে সৌদি তেল বিশ্ববাজারে নেওয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেখানেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে তেল পরিবহনের আরেকটি পথ এখনো খোলা আছে। লোহিত সাগর থেকে জাহাজ বাব আল-মান্দাব হয়ে দক্ষিণে না গিয়ে উত্তরে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকে যেতে পারে।

সমস্যা হলো, সৌদি আরবের বড় তেল ক্রেতাদের অনেকেই এশিয়ায়। তাদের কাছে তেল পাঠাতে সুয়েজ হয়ে যাওয়ার পথ অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল।

তেলের দাম ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে

পরিবহনপথ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রভাব এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে পড়েছে। শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই নয়, জ্বালানির দাম বেড়েছে অন্য ক্ষেত্রেও। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। ডিজেলের দামও ৬ ডলারের ছাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জন্য বিশ্ববাজারে যাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং যেসব পথ এখনো খোলা আছে, সেগুলো ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা সংকট তাই এখন আর শুধু একটি নৌপথের সমস্যা নয়। বাব আল-মান্দাবেও যদি পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন

×