ঢাকা রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘এআইয়ের গতি কমানো না গেলে মানবজাতি বিপদে পড়তে পারে’

‘এআইয়ের গতি কমানো না গেলে মানবজাতি বিপদে পড়তে পারে’
×

বিবিসির লরা কুয়েন্সবার্গের সঙ্গে কথা বলেন অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন (বায়ে)। ছবি- বিবিসি।

বিবিসি

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:২৭ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:১২

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতিতে প্রযুক্তি খাতের অনেকেই ‘সত্যিই ভীত’ বলে জানিয়েছেন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সাবেক এক গবেষক। তার আশঙ্কা, এআইয়ের অগ্রগতির গতি কমানো না গেলে অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতি বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারে। এমনকি তার ভাষায়, ‘এআইয়ের কারণে আমরা সবাই মারা যেতে পারি।’

অ্যানথ্রপিক থেকে পদত্যাগকারী ২৭ বছরের জ্যাকব কক্সন বিবিসির লরা কুয়েন্সবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তার পদত্যাগের ঘোষণা সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পদত্যাগপত্রে তিনি এআইয়ের নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়নের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কক্সন বলেন, ‘এআইয়ের অগ্রগতির গতি যদি আমরা কমাতে না পারি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সবাই মারা যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।’

প্রযুক্তিবিদ কক্সন এর আগে ওপেনএআইয়ে কাজ করেন। অ্যানথ্রপিক প্রধান দারিও আমোদেইও সম্প্রতি এআই উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'প্রযুক্তিটির উন্নয়ন বন্ধ করার প্রশ্ন নেই, তবে এর ঝুঁকি গুরুতর। ওই ঝুঁকি মোকাবিলায় কোম্পানি ও সরকারগুলোর সময় প্রয়োজন।'

ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান ও এক্সএআই প্রধান ইলন মাস্কও এআই খাতে গতি কমানো, নিয়ন্ত্রণ এবং এআই মডেল তৈরির ওপর স্বাধীন নজরদারির বিষয়ে আমোদেইয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। 

কক্সন বলেন, 'এআই উন্নয়নের গতি কমানোর উদ্যোগ শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এ ব্যাপারে চীনের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।'

তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা কাজ করেন, তারা এআই নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানাচ্ছেন গুরুত্বের সঙ্গে। কারণ, তারা নিজেদের এমন এক প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে পড়া অবস্থায় দেখছেন, যার পরিণতি নিয়ে তারা ভীত।’

এআইয়ের কারণে বিপর্যয় কেমন হতে পারে- এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন কক্সন। তিনি বলেন, 'অ্যানথ্রপিক প্রধান যেসব ঝুঁকির কথা বলেছেন, তার মধ্যে একটি হলো- এআই বটের একটি বিশাল বাহিনী সুপারকম্পিউটারের মতো কাজ করে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।' এমন পরিস্থিতি ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে কক্সনের পদত্যাগ ও বক্তব্যের বিষয়ে অ্যানথ্রপিক বলেছে, এআইয়ের অনেক সুফলের পাশাপাশি এর অনেক ঝুঁকির ব্যাপারে তারা সব সময়ই স্বচ্ছ। ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা মডেল তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, এআই মডেল কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে তারাই পথিকৃৎ। 

তবে এআই নিয়ে এমন সতর্কবার্তা ঘিরে সিলিকন ভ্যালিতে সমালোচনা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের মন্তব্য এআই নিয়ে বাড়তি আগ্রহ ও প্রচার তৈরির কৌশল হতে পারে। আবার সমালোচকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, অ্যানথ্রপিক প্রতিযোগিতা ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের জন্য চাপ তৈরি করতে চাইছে, যাতে অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের আধিপত্য আরও শক্ত হয়।

অ্যানথ্রপিক প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর রয়েছে। অন্যদিকে ওপেনএআই আইপিওর প্রস্তুতি নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গত শুক্রবার ফরচুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্যাম অল্টম্যান বলেন, 'এআই নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে শেয়ার বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।'

কক্সনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমাঁ দেলাংগ। সামাজিকমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, 'এআইয়ে ঝুঁকি সম্পর্কে কক্সনের মতামত নেওয়া অনেকটা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এসি মেরামতকারীর মতামত নেওয়ার মতো। 

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং কক্সনের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের দাবি, কক্সনের বক্তব্যকে সত্য নয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন হুয়াং। এর আগে তিনি এআই মানবজাতির অবসান ঘটাবে- এমন ধারণাকে ‘অর্থহীন’ বলে আখ্যায়িত করেন।

তবে কক্সন দাবি করেন, তার সহকর্মীদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিপদটি দুই বছরের মধ্যেই আসতে পারে। তার ভাষ্য, 'এআই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিজেদের জীবন নিয়েও পরিকল্পনা করছেন। তাদের কাজের প্রভাব নিয়ে ভাবছেন। কেউ কেউ দ্রুত এআই উন্নয়নের কারণে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা থেকে বাঁচতে কোথাও জমি কেনার চিন্তা করছেন।' 

গবেষকরা এআইয়ের ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখতে চান উল্লেখ করে কক্সন আরও বলেন, 'রোগ নিরাময় থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে এআই অবশ্যই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।'

কক্সনের এই বক্তব্য সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অ্যানথ্রপিকের বিজ্ঞানী ইভান হুবিঙ্গার তার সঙ্গে একমত হয়েছেন। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, এআই মানুষকে হত্যা করতে পারে- এমন আশঙ্কা তারা বিশ্বাস করেন। এক দশকের মধ্যে এমন ঘটনার আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ২০২৩ সাল থেকে ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড ও অ্যানথ্রপিক প্রধানরা প্রযুক্তিটির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন এআই মডেলগুলো আরও সক্ষমতা দেখানোর পর এসব সতর্কবার্তা জোরালো হয়েছে।

আরও পড়ুন

×