এআই: চীনকে হারাতে চান ট্রাম্প, বেইজিং কত বড় হুমকি?
এআই প্রতিযোগিতায় চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
সিএনএন
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:২০ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৩৫
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য ক্ষতির উদ্বেগ নিয়ে পুরো এক সপ্তাহ পার করেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। এমন সময়ে প্রযুক্তিটি নিয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন খাতটির পরাশক্তি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রেসিডেন্টরা। যা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।
অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআই ও গুগলের শীর্ষ নির্বাহীরা এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনার তাগিদ অনুভব করছেন। কিন্তু সেটি উপেক্ষা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এই প্রতিযোগিতায় চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রাখাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের বক্তব্যটি ছিল সোজাসাপটা। গত শনিবার তিনি বলেন, ‘এআই খাতে আমরা চীনের চেয়ে এগিয়ে আছি। সত্যি বলতে, আমরা এগিয়েই থাকতে চাই। কারণ এআই খাতে যে জিতবে, সেই আসল বিজয়ী।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন এমন মন্তব্য করেন তখন ভারতে ব্রিকস সম্মেলনে ছিলেন চীনের নেতা শি জিনপিং। গত রোববার সেখানে উপস্থিত অন্য নেতাদের উদ্দেশে শি বিলেন, ‘দেশগুলোর উচিত ওপেন সোর্স, উন্মুক্ততা, সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়কে উৎসাহিত করা।’ তিনি বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে কাঠামোটি কেমন হবে, তার বিস্তারিত জানাননি।
ট্রাম্প ও শির বক্তব্যের বৈপরীত্য এআই খাতে দুই পরাশক্তির আস্থার সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন এরইমধ্যে প্রযুক্তিটিকে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের কাছে এটি কৌশলগত সম্পদ ও মিত্র দেশগুলোতে রপ্তানির উপযোগী প্রযুক্তি।
চলতি মাসের শেষ দিকে দুই নেতার বৈঠকে বসার কথা। সেখানে এআই বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্পের সবশেষ চীন সফরেও প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে ফলাফল ছিল সীমিত। গত সপ্তাহে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দুই নেতা এআই নিয়ে আন্তঃসরকারি সংলাপ প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছেন।
তবে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অর্থবহ অগ্রগতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আপাতত খুব বেশি প্রত্যাশা করছেন না।
চীন কত বড় হুমকি?
এই প্রযুক্তির উন্নয়নে চীন বেশ কয়েক বছর ধরে মার্কিন কোম্পানিগুলোর তুলনায় পিছিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে চীনা কোম্পানিগুলো উন্নত এআই প্রসেসর আমদানি করতে পারছে না। জটিল এআই মডেল তৈরি ও প্রশিক্ষণের জন্য এসব প্রসেসর অপরিহার্য।
তবে গত বছর চীনা এআই স্টার্টআপ ডিপসিক বিশ্ববাসীকে চমকে দেয়। তারা কম খরচে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সক্ষমতার কাছাকাছি একটি মডেল তৈরি করে। এরপর থেকে চীনে এআই গবেষণা আরও গতি পেয়েছে। আলিবাবা, জেড ডট এআই, মিনিম্যাক্স ও সবশেষ মুনশট একই সক্ষমতার মডেল উন্মোচন করেছে। যা মার্কিন কোম্পানি অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআইয়ের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
চীন যখন তাদের মডেল উন্নত করছে তখন প্রতারণার অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের অভিযোগ, চীনা কোম্পানিগুলো মার্কিন মডেলের আউটপুট ব্যবহার করে নিজেদের মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর মাধ্যমে মার্কিন মেধাস্বত্ব চুরি হয়েছে। গত সপ্তাহে এফবিআই, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সিও একই আশঙ্কার কথা জানায়। তারা এটিকে ‘শিল্প-পর্যায়ের’ চুরি বলেছে।
বেইজিং এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন সোমবার বলেন, বয়ান ছড়ানো, সংঘাতের পথ অনুসরণ করা এবং বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিযোগিতা চালালে তা কেবল বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করবে। কারও স্বার্থ রক্ষা করবে না। সব পক্ষের উচিত উন্মুক্ততা ও মানুষের জন্য কল্যাণকর উপায়ে এআইকে এগিয়ে নেওয়া।
অন্যদিকে, চীনা এআই কোম্পানিগুলো মার্কিন আউটপুট ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করেনি। সিএনএনের পক্ষ থেকে ডিপসিক ও মুনশটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
চীনের মানুষ কি এআই নিয়ে উদ্বিগ্ন?
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী ও গবেষকেরা এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে চীনে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করাটা অনেক বেশি কঠিন। কারণ ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টি গণমাধ্যমকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনগণের ওপর নজরদারি চালায়।
চীনের প্রযুক্তি খাতও অনেক বেশি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালিত হয়। এআই কী তৈরি করতে পারবে এবং কীভাবে সেগুলো ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সরকার নিয়মকানুন নির্ধারণ করে। দেশটির জাতীয় এআই নিরাপত্তা মানদণ্ডে প্রশিক্ষণের ডেটা, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও নিষিদ্ধ কনটেন্ট নিয়ে বিভিন্ন শর্ত আছে।
এআই নিয়ে দেশটির জনসাধারণের আশাবাদও তুলনামূলকভাবে বেশি। গত বছর মার্কিন জনসংযোগ সংস্থা এডেলম্যানের এক জরিপে দেখা যায়, চীনের ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা এআইকে বিশ্বাস করেন। যুক্তরাষ্ট্রে এটি মাত্র ৩২ শতাংশ।
দুই পরাশক্তি একমত হতে পারবে?
আপাতত এ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার খুব বেশি কারণ নেই। মূল বাধা হলো আস্থার সংকট। দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধে গত বছরের অক্টোবরে বিরতি দেওয়া হলেও উত্তেজনা অব্যাহত আছে।
ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, একে অপরকে সহযোগিতা করলে চীন এমন প্রযুক্তি পেতে পারে, যা তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে বাড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে বেইজিং মনে করে, জাতীয় নিরাপত্তাকে অজুহাত দেখিয়ে ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের প্রযুক্তিগত উত্থান সীমিত করতে চাইছে।
গত মাসে চীন-যুক্তরাষ্ট্র এআই সংলাপ নিয়ে কয়েকটি শর্ত তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ইউইউয়ানতানতিয়ান। এটি চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পোস্টে লেখা হয়, কোনো আলোচনা শুরুর আগে ওয়াশিংটনকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তাদের এআই কোম্পানিগুলো দুই পক্ষের সম্মত হওয়া নিয়ম ও বিধিবিধান মেনে চলবে।
পোস্টটিতে আরও বলা হয়, প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকি ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এসব অত্যাধুনিক মডেলের নিরাপত্তার সীমা কে নির্ধারণ করবে সেটিই এখানে বড় প্রশ্ন।