সমান প্রতিযোগিতা, অসম প্রস্তুতি
ছবি-সংগৃহীত
মো. ইমরান আহম্মেদ
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৩৪
দেশে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর হাজারো পরিবারে আনন্দ, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কেউ কাঙ্ক্ষিত জিপিএ ৫ পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়, আবার কেউ প্রত্যাশার তুলনায় কম ফল করায় হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু একটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই– একটি পরীক্ষার ফল কেবল একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রতীক নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে তার পরবর্তী শিক্ষাজীবনের সুযোগ, শিক্ষার পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার অবস্থানও নির্ধারণ করে দেয়। তাই এসএসসির ফল নিয়ে আলোচনায় কে কত জিপিএ পেল, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়; বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আদৌ সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করছে কিনা, সেই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
ফল প্রকাশের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পাসের হার, প্রাপ্ত নম্বর কিংবা জিপিএ। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় তার পরের ধাপ থেকে। মাধ্যমিকের ফলের পর শিক্ষার্থীদের প্রথম বড় সিদ্ধান্ত হয়– কোন কলেজে ভর্তি হবে। আবার উচ্চ মাধ্যমিকের ফলের পর সামনে আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত– কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, কোন বিষয়ে পড়বে, নাকি চিকিৎসা, প্রকৌশল বা অন্য কোনো উচ্চশিক্ষার পথ বেছে নেবে। এই দুই ধাপের মাঝেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এমন এক বৈষম্যের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তী প্রতিটি প্রতিযোগিতায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দেশের খ্যাতনামা কলেজগুলো সাধারণত সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে। জিপিএ ৫ কিংবা তার কাছাকাছি ফল না হলে এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ প্রায় থাকে না। ফলে যারা শুরুতেই ভালো ফল করে তারা আবারও দক্ষ শিক্ষক, উন্নত শিক্ষার পরিবেশ, আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, প্রতিযোগিতামূলক সহপাঠী এবং নানা একাডেমিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পায়। অন্যদিকে তুলনামূলক কম ফল করা শিক্ষার্থীরা এমন সব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়, যেখানে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশের ঘাটতি বিদ্যমান। ফলে একই পরীক্ষা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তী দুই বছরের প্রস্তুতি আর সমান থাকে না।
এভাবেই সুযোগের ব্যবধান ধীরে ধীরে সাফল্যের ব্যবধানে রূপ নিতে শুরু করে। যে শিক্ষার্থী শুরুতে এগিয়ে রয়েছে, তাকে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে; আর যে শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে, সে আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকছে। এটি শুধু একটি ভর্তি নীতির প্রশ্ন নয়; বরং সুযোগের বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী করে তোলার একটি প্রক্রিয়া।
এই বৈষম্য শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাজধানী ও বড় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। অন্যদিকে প্রান্তিক অঞ্চলের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাসামগ্রীর অভাবে ভুগছে। ফলে একই বোর্ডের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ বাস্তবে কখনোই সমান হয় না।
এই অসম প্রস্তুতির পরও শেষ পর্যন্ত সবাইকে একই প্রতিযোগিতার ময়দানে দাঁড়াতে হয়। উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সবাই একই সূচনা রেখা থেকে অংশ নেয়। তখন আর কেউ বিবেচনা করে না, কে কী ধরনের শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, কার প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ল্যাব ছিল, কার ছিল না, কে অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছে পড়েছে আর কে শিক্ষক সংকটে পড়াশোনা করেছে। ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থী আবারও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
এই কাঠামোগত বৈষম্যের আরেকটি দৃশ্যমান ফল হলো কোচিং-নির্ভর প্রস্তুতির সংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী জেলা শহর কিংবা ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ছুটে আসে। এতে পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়; অনেক পরিবার ঋণ করেও সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠায়। অথচ একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করার কথা।
স্বাভাবিকভাবে তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় শুধু সর্বোচ্চ ফল করা শিক্ষার্থীদেরই কেন ভর্তি করবে? একটি পরীক্ষার ফল কি একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে? নাকি ভর্তি নীতিতে শিক্ষার্থীর সামাজিক বাস্তবতা, ভৌগোলিক অবস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, ব্যক্তিগত সম্ভাবনা এবং অন্যান্য সক্ষমতার মতো বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় আনা উচিত?
প্রশ্নটি শুধু শিক্ষানীতির নয়; এটি সাংবিধানিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন। দেশের সংবিধান সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলে এবং শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই বিবেচনায় সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কারণ সমান প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন শেখার সুযোগও তুলনামূলকভাবে সমান থাকে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছি, যেখানে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী আরও বেশি সুবিধা পাচ্ছে আর সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী আরও পিছিয়ে পড়ছে।
সুযোগের সমতা নিয়ে এই আলোচনা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানে প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়ন কাঠামো মূলত জাতীয় শিক্ষাক্রমের সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি উপযোগী। অথচ দেশে জাতীয় শিক্ষাক্রম, ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদ্রাসা– এই তিনটি প্রধান শিক্ষাধারা বিদ্যমান। তাদের পাঠ্যক্রম, শেখার ধরন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অনেক সময় অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। এটি নিঃসন্দেহে তাদের মেধা, অধ্যবসায় ও সক্ষমতার প্রমাণ। কিন্তু কয়েকটি ব্যতিক্রমী সাফল্য দিয়ে কাঠামোগত বৈষম্যকে অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে ইংরেজি মাধ্যমের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী দেশের পরিবর্তে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বেছে নিচ্ছে। এর অন্যতম কারণ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থায় তাদের শিক্ষাক্রমের বাস্তবতার পর্যাপ্ত প্রতিফলন না থাকা। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা ভিন্ন শিক্ষাধারায় পড়লেও মূল্যায়নের কাঠামো এখনও সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
এই বাস্তবতায় শুধু সমস্যার বর্ণনা নয়, সমাধানের পথ নিয়েও ভাবতে হবে। এখন সময় এসেছে শুধু ফলের ভিত্তিতে নয়, শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা ও সুযোগের ভিত্তিতেও শিক্ষানীতি পুনর্বিবেচনা করার। প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক বণ্টনে ভারসাম্য আনা, ডিজিটাল শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত একাডেমিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষাধারার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া– এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের খ্যাতনামা কলেজগুলোর ভর্তি নীতিতেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। সব আসন শুধু সর্বোচ্চ ফলধারী শিক্ষার্থীদের জন্য না রেখে, প্রান্তিক অঞ্চল, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষ সামাজিক বাস্তবতা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অংশ সংরক্ষণের মতো নীতিগত আলোচনা শুরু হতে পারে। এতে মেধার মূল্য কমবে না; বরং সুযোগের বৈষম্য কিছুটা হলেও কমে আসবে এবং প্রকৃত অর্থে মেধার বিকাশের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে।
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য কেবল কতজন জিপিএ ৫ পেল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং বিচার করা উচিত, কতজন শিক্ষার্থী তাদের প্রকৃত সম্ভাবনা বিকাশের সমান সুযোগ পেল। যদি একজন শিক্ষার্থী প্রতিটি ধাপে উন্নত সুযোগ পায় আর অন্যজন প্রতিটি ধাপে সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে সেই প্রতিযোগিতাকে ন্যায্য বলা যায় না। তখন পরীক্ষার ফল শুধু মেধার নয়, সুযোগেরও প্রতিফলন হয়ে ওঠে। শিক্ষা তখনই ন্যায়সংগত হয়, যখন প্রতিযোগিতার সূচনারেখা সবার জন্য সমান না হলেও, অন্তত সেই ব্যবধান কমিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে।
মো. ইমরান আহম্মেদ: লেখক ও গবেষক
[email protected]