ছোট হচ্ছে ইলিশ, খালি হচ্ছে ঘাট
ফাইল ছবি-সংগৃহীত
হারুনুর রশীদ, মোহাম্মদ মতিউর রহমান, মুহাম্মদ মাহফুজুল হক, মো. জসিম উদ্দিন, জোয়ার্দ্দার ফারুক আহমেদ
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৬
চাঁদপুরের বড় স্টেশন মাছঘাট, ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা দেশের সবচেয়ে বড় ইলিশের পাইকারি বাজার। আগে ভরা মৌসুমে এখানে দিনে এক থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ বিক্রি হতো; এবার জুলাইয়ে এক দিনে আসেনি একশ মণও। পরিস্থিতি এতটাই অস্বাভাবিক যে সিইজিআইএসসহ বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞরা মধ্য জুলাইয়ে সরেজমিন গিয়ে খতিয়ে দেখেছেন ঠিক কী ঘটছে; সবার একটাই প্রশ্ন– ‘এই ভরা মৌসুমে ইলিশ গেল কই?’। যে ইলিশ আগে দেড়-দুই হাজার টাকায় মিলত, এখন তার দাম আড়াই থেকে প্রায় তিন হাজার টাকা। এই দৃশ্য একা চাঁদপুরের নয়; খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালীর মতো দেশের প্রায় সব প্রধান ইলিশ অবতরণ কেন্দ্রেই একই চিত্র। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে ২০২২-২৩ অর্থবছরের রেকর্ড পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টন উৎপাদনের পর টানা কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমেছে প্রায় পাঁচ লাখ টনে, গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিএফডিসির আওতাধীন খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে জুলাইয়ের অবতরণ ২০২২ সালের প্রায় ৩৮.৫ টন থেকে নেমে ২০২৬ সালে হয়েছে মাত্র ১.৫ টন। বরিশাল বিভাগেও বার্ষিক আহরণ ২০২২-২৩ সালের রেকর্ড তিন লাখ ৭২ হাজার টন থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৬৬ হাজার টনে। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক– ইলিশ কি সত্যিই কমে যাচ্ছে?
অতিরিক্ত আহরণই মূল চাপ
বিজ্ঞানীদের মতে, ইলিশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ মেলে অতিরিক্ত আহরণে। বাংলাদেশে ইলিশের একাধিক স্টক-মূল্যায়ন গবেষণায় ইলিশের ‘এক্সপ্লয়টেশন রেট’ বা আহরণ-অনুপাত সহনীয় সীমার তুলনায় বেশি (প্রায় ০.৬১ পর্যন্ত) পাওয়া গেছে, যেখানে টেকসই মৎস্য আহরণের মানদণ্ড অনুযায়ী আহরণ-অনুপাত ০.৫-এর কম থাকা উচিত। পার্শ্ববর্তী ভারতের হুগলি মোহনা অঞ্চলে একই প্রজাতির ওপর করা একটি গবেষণায় এই অনুপাত মৌসুমভেদে ০.৫৯ থেকে ০.৭৯ পর্যন্ত পাওয়া গেছে– যা একই আঞ্চলিক জলসীমায় বাংলাদেশ ও ভারতের এই দুই দেশের সমুদ্র-মোহনা-নদীর উজান-ভাটিতে নিয়মিত পরিযায়ী এই মাছের ওপর ক্রমবর্ধমান আহরণ চাপের একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক চিত্র তুলে ধরে। মৎস্যবিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন সমস্যাকে আলাদা করে দেখেন– ‘বৃদ্ধি-সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত আহরণ’ (যেমন– মনোফিলামেন্ট কারেন্ট জাল দিয়ে পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার আগেই জাটকা ধরে ফেলা) এবং ‘অন্তর্ভুক্তি-সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত আহরণ’ (যেমন– ডিমওয়ালা মা ইলিশের অতিরিক্ত আহরণ, যা ভবিষ্যতের প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করে)। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২১ সালেই অবৈধভাবে জাটকা নিধনের কারণে দেশ হারিয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার টন পরিণত ইলিশ। গবেষণায় স্ত্রী-ইলিশের প্রথম প্রজননক্ষম হওয়ার আকার পাওয়া গেছে প্রায় ৩১ সেন্টিমিটার; আর বিএফআরআইর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, আহরিত ইলিশের গড় আকার তিন বছরে প্রায় ৩৭ সেন্টিমিটার থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ গড় আহরিত মাছের আকার দিনকে দিন কমছে এবং তা প্রজননক্ষম হওয়ার আকারের খুব কাছাকাছি, যার মানে বড় ও পরিণত মাছ ক্রমেই দুর্লভ হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত আহরণ চলতে থাকলে বড় মাছগুলোই বেশি ধর পড়ে যায়; ফলে ‘অতিরিক্ত মৎস্য আহরণজনিত বিবর্তন’-এর মতো ঘটনা ঘটতে পারে, অর্থাৎ প্রজন্মক্রমে মাছ আগের চেয়ে ছোট সাইজে থাকতেই প্রজননক্ষম হয়ে পড়বে, যা একটি মাছের পপুলেশনের টিকে থাকার সম্ভাবনা কমিয়ে দেবে। যদিও বাংলাদেশের ইলিশে এই অতিরিক্ত আহরণজনিত বিবর্তন ইতোমধ্যে হয়ে গেছে এমন সরাসরি প্রমাণ এখনও নেই, কিন্তু সময়ের সঙ্গে অধিক হারে ছোট মাছে পরিপক্ষ ডিম পাওয়ার রিপোর্ট এই সম্ভাবনাকেই সত্যি করে তোলে।
নদীর বদলে যাওয়া পথ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ভূমিকা
অতিরিক্ত আহরণের পাশাপাশি নদীর নিজের বদলে যাওয়া চেহারাও ইলিশ সম্পদের জন্য আরেকটি বড় হুমকি– যা মূলত ইলিশের পরিযায়নে বড় বাধা তৈরি করছে। আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া, পলি জমে চর তৈরি হওয়া আর অসংখ্য বাঁধ-পোল্ডারের কারণে পদ্মা-মেঘনা-তেঁতুলিয়াসহ ইলিশ বিচরণের অধিকাংশ নদীর তলদেশে অসংখ্য ডুবোচর তৈরি হয়েছে। নদীতে ইলিশ সাধারণত পাঁচ মিটারের বেশি গভীরতার পানি পছন্দ করে, অথচ পরিযায়ন পথের বহু অংশে গভীরতা নেমে এসেছে দুই-তিন মিটারে। পদ্মা নদীর শুধু শরীয়তপুর অংশেই অন্তত ৩০টি ডুবোচর চিহ্নিত হয়েছে। এ ছাড়া মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে মোহনায় ও নদীর উপকূলীয় অংশে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ বাড়ে, যা ডিম ও পোনার জন্য প্রতিকূল এবং মা ইলিশের নদীতে ঢোকার সংকেতকে ব্যাহত করে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন হচ্ছে; ১৯৮২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১০৭টি সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে। বলা যায়, অতিরিক্ত আহরণ ইলিশ সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি বা সিলিং নির্ধারণ করে দিচ্ছে, আর প্রতি বছরের বৃষ্টিপাত ও নদীপ্রবাহ ঠিক করে দিচ্ছে সেই ভিত্তির মধ্যে কোন বছর পরিযায়ন ও উৎপাদন কেমন হবে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন (ও নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ)-এর কারণে বৃষ্টিপাত ও মিঠাপানির প্রবাহের তারতম্যঘটিত প্রভাবও সুস্পষ্ট; ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত ইলিশের উৎপাদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ মৌসুমে বর্ষার রেকর্ড বৃষ্টিপাত (প্রায় ১,৭১০ মিমি) ও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সর্বোচ্চ মিঠাপানির প্রবাহ (প্রায় ১,২৫০ বিসিএম) হয়তো সমুদ্র থেকে ইলিশের পরিযায়ন বাড়িয়ে সে বছর দেশে সর্বোচ্চ ৫.৭১ লাখ টন রেকর্ড উৎপাদন নিশ্চিত করেছিল; আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও হ্রাসপ্রাপ্ত নদীপ্রবাহের কারণে ইলিশের উৎপাদন নিম্নমুখী হয়েছে। এর বাইরে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা হয়ে মেঘনায় মেশা শিল্পবর্জ্য পানির অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে ও প্ল্যাঙ্কটন ধ্বংস করে ইলিশের খাদ্যশৃঙ্খলকেও দুর্বল করছে, যা মাছের ধীর বৃদ্ধিরও একটি কারণ।
সংরক্ষণের ইতিহাস ও টেকসই ব্যবস্থাপনার রূপরেখা
এই সংকটকে শুধু ব্যর্থতার গল্প বলা ঠিক হবে না, কারণ ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল মাত্র দুই লাখ টন; এরপর ২০০৫ সালে অভয়াশ্রম ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইলিশ সংরক্ষণের যে উদ্যোগ শুরু হয়, তারই ধারাবাহিকতায় পর্যায়ক্রমে ২০২২-২৩ সালে এসে রেকর্ড উৎপাদন সম্ভব হয়েছিল। মৎস্য অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ডফিশ সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে ইকোফিশ প্রকল্পে জেলেদের সরাসরি সংরক্ষণে যুক্ত করার ফলে প্রকল্প এলাকায় বার্ষিক আহরণ ১০-১১ শতাংশ বেড়েছিল এবং মাছের গড় আকার বড় হয়েছিল। এই সাফল্য মনে করিয়ে দেয়, সংরক্ষণ কাজ করে; তবে তার সুফল স্থায়ী গ্যারান্টি নয়; তাই প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত আহরণ, নদীর পরিবর্তন ও জলবায়ুগত ঝুঁকি নতুন করে মোকাবিলা করতে হয়। নদীতীরের জেলেরা প্রায়ই মহাজনি ঋণের চাপে মৌসুম নির্বিশেষে যা পাওয়া যায় তাই ধরতে বাধ্য হন, আর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে বিস্তীর্ণ নদী-উপকূল এলাকায় প্রয়োজন হয় বাড়তি জনবল ও সরঞ্জাম– এই বাস্তবতাগুলো মাথায় রেখেই সমাধান খুঁজতে হবে। সামনের পথ তাই যৌথ ব্যবস্থাপনার। প্রথমত, রামগতি-কমলনগর ও মতলবের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সারা বছর ঝুঁকিভিত্তিক নদী-উপকূল টহল জোরদার করা দরকার। দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞাকালে জেলেদের জন্য সময়মতো ও পর্যাপ্ত ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা এবং মহাজনি ঋণের বিকল্প হিসেবে সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ চালু করলে জেলেরা বাধ্য হয়ে আইন ভাঙার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। তৃতীয়ত, পলি জমে যাওয়া প্রধান নদীপথে পরিবেশ-সংবেদনশীল ড্রেজিং চালিয়ে অন্তত পাঁচ মিটার গভীরতার করিডোর বজায় রাখা প্রয়োজন। চতুর্থত, উপকূলের কাছাকাছি অগভীর জলে শিল্প ট্রলারের প্রবেশ ঠেকাতে গভীরতাভিত্তিক আহরণ-বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা দরকার। আর সবশেষে, চাঁদপুর, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রামসহ প্রধান ইলিশ ঘাটগুলোর অবতরণ, মাছের আকারের ও সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা যৌথভাবে অভিযোজিত ব্যবস্থাপনা এগিয়ে নিতে পারবেন।
জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশ এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কিন্তু মাছের গড় আকার ছোট হয়ে আসা, নদীর ঘাট খালি হয়ে যাওয়া আর নদীর পরিবেশগত ক্ষয়– এই সংকেতগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয় যে ইলিশ সম্পদের ওপর চাপ বাস্তব। সমুদ্র, মোহনা, নদী, জেলে আর বাজার– এই পুরো শৃঙ্খলটাই একটি সংযুক্ত ব্যবস্থা। প্রশ্নটা তাই শুধু ‘ইলিশ কমছে কিনা’ তা নয়, বরং প্রশ্নটা হলো– সংশ্লিষ্ট দপ্তর, গবেষক ও নদীনির্ভর জেলে সম্প্রদায় মিলে ইলিশ সম্পদের পুনরুৎপাদন ক্ষমতা কীভাবে ফিরিয়ে আনতে পারবে, আর ফিরে আসবে হারানো সেই রুপালি সমৃদ্ধি।
ড. হারুনুর রশীদ, ড. মোহাম্মদ মতিউর রহমান, ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক, ড. মো. জসিম উদ্দিন, ড. জোয়ার্দ্দার ফারুক আহমেদ; লেখকরা সবাই অধ্যাপক, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
- বিষয় :
- ইলিশ