ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

হেগের রায় এবং আমাদের নদী

হেগের রায় এবং আমাদের নদী
×

নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালত

এনায়েত এইচ জাকারিয়া

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৫৪ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:০৫

গত ৩১ আগস্ট নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত রাখার ভারতীয় সিদ্ধান্ত বৈধ নয়। কোনো চুক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক আইনেই তার বৈধতা নেই। রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞাও এসেছে। নয়াদিল্লি বলেছে: আদালতটি অবৈধভাবে গঠিত, তার কোনো এখতিয়ারই নেই এবং স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
ভারতের অবস্থান বুঝতে দুটি নথি পাশাপাশি রাখলেই যথেষ্ট। গত বছরের ৩ জানুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের ইয়ারলুং সাংপো মেগা-বাঁধ প্রসঙ্গে বিবৃতি দেয়। সেখানে ভারত নিজেকে বর্ণনা করে ‘নদীর পানিতে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবহারকারী-অধিকারসম্পন্ন ভাটির রাষ্ট্র’ হিসেবে, এবং দাবি করে—উজানের কার্যক্রমে ভাটির রাষ্ট্রের স্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে চেয়েছে প্রবাহের উপাত্ত, উজানের প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য এবং বিশেষজ্ঞ-পর্যায়ের বৈঠক।
এখন উল্টো দিক। ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৭টি। গঙ্গায় পানিবণ্টন চুক্তি হয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টে মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক বসেছিল ১২ বছর পর, আর ভারতীয় সরকারি বিবরণী অনুযায়ী সেখানে প্রধান অর্জন ছিল উপাত্ত বিনিময়ের নদীর সংখ্যা ৭ থেকে ১৫ তে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ ৫৭টি নদীর মধ্যে ১৫টির তথ্য সেটাও অগ্রগতি হিসেবে ঘোষিত।

যে ভাষায় ভারত চীনের কাছে কথা বলে, ঠিক সেই ভাষা বাংলাদেশের মুখে শুনলে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। উজানে থাকলে পানি সার্বভৌম অধিকার, ভাটিতে থাকলে আন্তর্জাতিক দায়, একই রাষ্ট্রের দুই ভূগোলে দুই আইন। এটি অনুমান নয়, নথিবদ্ধ।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় চীনকে চিঠি দিয়ে চেয়েছিল পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং জলবায়ু ও দুর্যোগ প্রভাব মূল্যায়ন। জবাব আসেনি। অর্থাৎ ভারত চীনের কাছে যা চায়, বাংলাদেশ চীনের কাছে তা চায়, আর বাংলাদেশ ভারতের কাছে তা পঞ্চাশ বছর ধরে চেয়ে আসছে। শৃঙ্খলটা পরিষ্কার: প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের ভাটির স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন উদ্ধৃত করে, নিজের উজানের সুবিধায় তা অস্বীকার করে। বাংলাদেশ এই শৃঙ্খলের একেবারে শেষ প্রান্তে—আমাদের ভাটিতে আর কেউ নেই। মনে রাখা দরকার, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার প্রবাহের ৭০ শতাংশ আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। উজানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাই আমাদের ভূগোলের প্রশ্ন, নিছক কূটনীতির নয়।

ভারত তৃতীয় পক্ষের বিচার নীতিগতভাবে অস্বীকার করে না—সুবিধামতো বাছাই করে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে কুলভূষণ যাদব মামলায় ভারত নিজেই পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে নিয়ে গিয়েছিল এবং রায় পেয়েছিল। ২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা নিয়ে বাংলাদেশের আনা সালিশি রায়ও ভারত মেনে নিয়েছিল, যদিও তাতে বিরোধপূর্ণ এলাকার সিংহভাগ বাংলাদেশ পায়। অথচ সিন্ধু নিয়ে সালিশি আদালতের এখতিয়ারই সে অস্বীকার করছে।
আর আমাদের জন্য দরজাটা আগেই বন্ধ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এখতিয়ার বিষয়ে ভারতের সংশোধিত ঘোষণায় কমনওয়েলথ সংরক্ষণ বহাল রাখা হয়েছে—কমনওয়েলথের সদস্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধে ভারত আদালতের বাধ্যতামূলক এখতিয়ার মানে না। বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্য। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ জলপ্রবাহ কনভেনশনে ভারতের ভোটদানে বিরত থাকার কারণও ছিল একই—বাধ্যতামূলক বিরোধ-নিষ্পত্তির ধারা; ভারত তখন বলেছিল, নিষ্পত্তির পদ্ধতি পক্ষগুলোর ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই ডিসেম্বরে। এটি বিপদ, আবার পঞ্চাশ বছরে সবচেয়ে বড় সুযোগও, কারণ নতুন চুক্তির শর্ত নতুন করে লেখা হবে। ভারত ফেব্রুয়ারিতে সংসদে জানিয়েছিল নবায়ন আলোচনা তখনো শুরু হয়নি; জুলাইয়ে তাদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিই বিলম্ব না করার তাগিদ দিয়েছে। সময় আমাদের বিরুদ্ধে।
প্রথমত, নতুন চুক্তিতে তিনটি ধারা অ-আলোচনাসাপেক্ষ হতে হবে: শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম প্রবাহের গ্যারান্টি ক্লজ; লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিরোধ-নিষ্পত্তি ও সালিশি ধারা; এবং রিয়েল-টাইম তথ্য-অধিকার। মনে রাখা দরকার, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেকের নিশ্চয়তা ছিল, ১৯৯৬-এ তা বাদ পড়ে। জবাবদিহি বা সালিশের কোনো বিধান না থাকাই বর্তমান চুক্তির কেন্দ্রীয় দুর্বলতা।

দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি না হলে কী হবে, তার খসড়া এখনই তৈরি রাখা চাই। মেয়াদোত্তীর্ণ চুক্তি মানে আইনি শূন্যতা, আর শূন্যতায় সুবিধা পায় উজানের রাষ্ট্র। সময়াবদ্ধ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার প্রস্তাব হাতে না থাকলে জানুয়ারিতে আমরা খালি হাতে বসে থাকব।
তৃতীয়ত, দাবির কাঠামো বাণিজ্যিক থেকে পরিবেশগত করতে হবে। কিউসেকের দর-কষাকষিতে উজানের দেশ সর্বদা জিতবে। কিন্তু সুন্দরবন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য ও রামসার সাইট; লবণাক্ততা ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে; রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৮-১০ ফুট থেকে ১০০ ফুটের নিচে নেমেছে; গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টর ঝুঁকিতে। এই ভাষায় বললে বহুপাক্ষিক সমর্থন জোটে।
চতুর্থত, বহুপাক্ষিকীকরণ চালিয়ে যেতে হবে। গত বছরের ২০ জুন বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ১৯৯২ সালের জাতিসংঘ পানি কনভেনশনে যোগ দিয়েছে। সীমাটা স্পষ্ট স্বীকার করা ভালো: ভারত পক্ষ নয়, ফলে এতে তাকে সরাসরি বাধ্য করা যায় না, আর ফারাক্কার মতো পুরনো বিরোধে এটি পশ্চাদমুখীভাবে প্রযোজ্যও নয়। কিন্তু মূল্যটা বাস্তব—পানির দাবি অনুগ্রহ থেকে অধিকারে রূপান্তরিত হয়।

পঞ্চমত, ভারতের নিজের যুক্তি তার দিকেই ফেরানো। চীনের কাছে ভারত যে তিনটি জিনিস চায়—প্রকল্পের পূর্ব-তথ্য, প্রভাব মূল্যায়ন ও নিয়মিত উপাত্ত—কূটনীতিতে আমাদের দাবি হুবহু সেই তিনটিই হওয়া উচিত, এবং তা ভারতের নিজের বিবৃতি উদ্ধৃত করেই তোলা উচিত। চলতি বছরের এপ্রিলে ভারত তিস্তা ও গঙ্গাসহ কিছু আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে নদী-অববাহিকা ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি চালু করেছে—সেচ সম্প্রসারণ, জলবিদ্যুৎ ও নদী-সংযোগসহ। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পূর্ব-পরামর্শের প্রমাণ নেই। প্রশ্নটি প্রতিটি বৈঠকে লিখিতভাবে তোলা দরকার, যাতে নথি তৈরি হয়।

ষষ্ঠত, প্রমাণের ভাণ্ডার গড়া—প্রবাহের স্বাধীন উপাত্ত, ক্ষতির অর্থনৈতিক পরিমাপ, পরিবেশগত প্রভাবের নিরপেক্ষ ডকুমেন্টেশন। রায় পাওয়ার আগে প্রমাণ লাগে, আর প্রমাণ তৈরি হয় বছরের পর বছর ধরে—সংকটের মুহূর্তে নয়। আলোচনার দলে আমলার সঙ্গে পানিবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ যুক্ত করাও জরুরি।
সপ্তম পরামর্শটি সম্ভবত সবচেয়ে অপ্রিয়: চীনকে দর-কষাকষির তাস হিসেবে ব্যবহারের প্রলোভন এড়াতে হবে। আমরা ব্রহ্মপুত্রেও ভাটির দেশ। উজানের একতরফা কর্তৃত্বকে এক জায়গায় বৈধতা দিলে অন্য জায়গায় তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক ভিত্তি থাকে না। আমাদের শক্তি ভূরাজনৈতিক নয়, আইনি ও নৈতিক ধারাবাহিকতায়।
ভারত বলে, গঙ্গার প্রবাহ হ্রাসের একমাত্র কারণ ফারাক্কা নয়—জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজানে উত্তরপ্রদেশ-বিহারে ব্যবহারও দায়ী। তিস্তার ক্ষেত্রে তারা মনে করায়, ভারতের সংবিধানে পানি রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়। যৌথ নদী কমিশনের নিয়মিত বৈঠক ও কুশিয়ারা সমঝোতা স্মারককে তারা সহযোগিতার প্রমাণ হিসেবে দেখায়। জলবায়ুর অংশে সারবত্তা আছে। কিন্তু যুক্তিটি মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যায়: প্রবাহ অনিশ্চিত হলে স্থির শতাংশভিত্তিক সূত্র আরও বিপজ্জনক, ন্যূনতম গ্যারান্টি আরও জরুরি। আর রাজ্যের সম্মতির প্রশ্নটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আন্তর্জাতিক আইনে কোনো রাষ্ট্র নিজের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে চুক্তি-দায় এড়ানোর অজুহাত করতে পারে না।
এ বছর দুই সরকারই বদলেছে। ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে, মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে। যে রাজনৈতিক বাধা তিস্তা চুক্তিকে ২০১১ ও ২০১৭ সালে দুই দফায় আটকে দিয়েছিল, তা এখন আগের মতো নেই। সুযোগের জানালা খুলেছে, কিন্তু জানালা বেশিদিন খোলা থাকে না।

হেগের রায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা রাজনৈতিক নয়, কাঠামোগত। পাকিস্তান রায় পেয়েছে, কারণ ১৯৬০ সালের চুক্তিতে কেউ একজন নিষ্পত্তির ধারা লিখে রেখেছিলেন এবং বিশ্বব্যাংককে গ্যারান্টার করেছিলেন। আমাদের ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে কেউ সেটা লেখেননি। নিষ্পত্তির ধারা ছাড়া চুক্তি একটি প্রতিশ্রুতি; ধারাসহ চুক্তি একটি অধিকার। আগামী ডিসেম্বরে আমরা কোনটি সই করছি, এই একটি প্রশ্নের উত্তরেই আগামী তিন দশকের পানি-ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
 

এনায়েত এইচ জাকারিয়া: উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও জননীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×