ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

এআই প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান 

এআই প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান 
×

সঠিক নীতি, শিক্ষা ও দক্ষতা থাকলে এআই উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

রিয়াদ হাসনাইন

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৫৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত বদলে দিচ্ছে বৈশ্বিক শ্রমবাজার। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল  রপ্তানি– দুই ক্ষেত্রেই এটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৭ সালে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অনলাইন লেবার ইনডেক্সে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমের ১৬ শতাংশ সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশকে ভারতের পর দ্বিতীয় স্থানে দেখানো হয়েছিল। বর্তমানে দেশে প্রায় ছয় লাখ ৫০ হাজার সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার আছেন এবং এই খাতের বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিসর প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু পুরোনো পাঠ্যক্রম, এআই-দক্ষ প্রশিক্ষকের ঘাটতি ও সীমিত কম্পিউটিং সুবিধা দেশের প্রস্তুতিকে দুর্বল করে রেখেছে। কম মূল্যের রুটিন আউটসোর্সিং থেকে দ্রুত এআই, ক্লাউড, ডেটা ও অটোমেশনভিত্তিক উচ্চমূল্যের দক্ষতায় যেতে না পারলে বাংলাদেশ বিদ্যমান বাজারের একটি অংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানা, মতিঝিলের ডেটা প্রসেসিং ও প্রশাসনিক কাজ কিংবা ঢাকার কল সেন্টার ও বিপিও প্রতিষ্ঠানে বিপুল মানুষ এমন কাজে যুক্ত, যার অনেকটাই ভবিষ্যতে এআই ও অটোমেশনের মাধ্যমে আরও দ্রুত ও কম খরচে করা সম্ভব হতে পারে। তবে এআই এলেই বিপুল মানুষ সরাসরি চাকরি হারাবেন– বিষয়টি এত সরল নয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের গবেষণা বলছে, বিশ্বে প্রতি চারজন কর্মীর একজন এমন পেশায় আছেন, যেখানে জেনারেটিভ এআইর কিছু মাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে অধিকাংশ চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে কাজের ধরন, দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ক্লারিক্যাল কাজ সবচেয়ে বেশি প্রভাবের মুখে থাকা পেশাগুলোর মধ্যে রয়েছে।

তৈরি পোশাক, প্রবাসী কর্মীদের আয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও বিপিও– এই তিন ক্ষেত্র বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এআই ও অটোমেশন তিন ক্ষেত্রেই কাজের ধরন বদলাতে পারে। তৈরি পোশাক খাতে এআইভিত্তিক মান নিয়ন্ত্রণ, চাহিদা পূর্বাভাস, উৎপাদন পরিকল্পনা ও ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনার ব্যবহার বাড়ছে। এর অর্থ সব শ্রমিকের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে, এমন নয়। বরং পুনরাবৃত্তিমূলক কিছু কাজ কমতে পারে এবং প্রযুক্তি পরিচালনা, ডেটা বিশ্লেষণ ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হতে পারে।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও পরিবহন, উৎপাদন, গুদাম ব্যবস্থাপনা ও কিছু সেবা খাতে অটোমেশন বাড়লে স্বল্পদক্ষ কর্মীদের প্রতিযোগিতা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

একইভাবে ফ্রিল্যান্সিং ও বিপিও খাতে ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ ট্রান্সক্রিপশন, মৌলিক কনটেন্ট তৈরি এবং কিছু প্রাথমিক সফটওয়্যার কাজ এখন এআই টুলের সহায়তায় করা যাচ্ছে। সফটওয়্যার, ওয়েব ও মিডিয়া সংশ্লিষ্ট কিছু পেশাতেও এআইয়ের প্রভাব বাড়ছে।

বাংলাদেশে জাতীয় এআই নীতি নেই– এমন কথা এখন আর সঠিক নয়। সরকারের ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পলিসি ২০২৬-৩০-এর ড্রাফট প্রকাশ হয়েছে চলতি বছরের সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। সরকারি এআই পলিসি পোর্টাল অনুযায়ী, জনপরামর্শ পর্ব শেষ হয়েছে এবং পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

এর আগে আইসিটি বিভাগের নেতৃত্বে ইউনেস্কো, ইউএনডিপি ও এটুআইর সহযোগিতায় বাংলাদেশের এআই প্রস্তুতি মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে। এতে নীতি, প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, ডেটা, শিক্ষা, দক্ষতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।

এআইর যুগে প্রস্তুতি শুধু নীতিমালা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। শিক্ষার্থীরা বাস্তবে এআই, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড কম্পিউটিং ও অটোমেশন নিয়ে কতটা কাজ করতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই হাজার এআই-সংশ্লিষ্ট গবেষণা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। তবে দেশে আরও কাঠামোবদ্ধ এআই পাঠ্যক্রম, নৈতিক এআই শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। মেয়েদের ও নারীদের এআই ও এসটিইএম  শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আধুনিক এআই তৈরি ও পরিচালনায় প্রয়োজন উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধা, জিপিইউ অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম এবং মানসম্মত ডেটা । ইউনেস্কোর বাংলাদেশ এআই প্রস্তুতি প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন। ফলে ডিজিটাল সংযোগের ব্যবধান এখনও বড় বাধা।

একই সঙ্গে বাংলা ও স্থানীয় ভাষাভিত্তিক এআই, বৈচিত্র্যময় ডেটাসেট এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝতে পারে– এমন প্রযুক্তি তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। ইউনেস্কো জানিয়েছে, বাংলাদেশের কিছু স্টার্টআপ ইতোমধ্যে নিজস্ব এআই সিস্টেম ও বাংলা ভাষাভিত্তিক বড় ভাষা মডেল তৈরিতে কাজ করছে।

ব্যাংকিং, পোশাক, কৃষি, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় এআইর ব্যবহার বাড়ছে। এটি ইতিবাচক হলেও শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলে দেশের নিজস্ব এআই সক্ষমতা গড়ে ওঠার গতি ধীর হতে পারে। নিজস্ব গবেষণা, স্টার্টআপ, ডেটা, মেধাস্বত্ব ও দক্ষ জনবল তৈরি না হলে এআই অর্থনীতি থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যের বড় অংশ বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের কাছে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ২০২৬ সালের জুনে সরকার ও ইউনেস্কো সরকারি কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক এবং সরকারি ক্রয়-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য দায়িত্বশীল এআই ব্যবহার ও এআই গভর্ন্যান্সবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণও শুরু করেছে।
এআই ইতোমধ্যে এসেছে। এখন সঠিক নীতি, শিক্ষা ও দক্ষতা থাকলে এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, নতুন শিল্প গড়ে তুলতে, সরকারি সেবা উন্নত করতে এবং উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। আইএলওর বিশ্লেষণও বলছে, এআইর প্রভাবের হিসাবকে সরাসরি চাকরি হারানোর সংখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
প্রস্তুতি নিতে দেরি হলে পরবর্তী কর্মসংস্থান সংকট ডিজিটাল রূপ নিতে পারে। আর সময়মতো দক্ষতা, অবকাঠামো ও নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বিনিয়োগ করা গেলে একই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

রিয়াদ হাসনাইন: নীতি বিশ্লেষক
 

আরও পড়ুন

×