উচ্চশিক্ষা
তদন্তের নামে ভয়ের সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে?
প্রশ্ন ও মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরি করে
মো. আব্দুল আওয়াল
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:১১ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৩৬
বিশ্ববিদ্যালয় আনুগত্য পরীক্ষার জায়গা নয়। এখানে প্রশ্ন করা, ভিন্নমত পোষণ করা কিংবা রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা অপরাধ নয়। বরং প্রশ্ন ও মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরি করে এবং সমাজকে পথ দেখায়। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যেভাবে তদন্ত কমিটি গঠিত হচ্ছে, তাতে প্রশ্ন উঠেছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে।
গত ৪ আগস্ট একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তৎপরতার অভিযোগ তোলা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ষোলোটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত বা তথ্য-অনুসন্ধান কমিটি গঠনের খবর পাওয়া যায়।
অভিযোগ গুরুতর হলে তদন্ত হওয়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেউ প্রকৃতপক্ষে আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে এখানেই আসল প্রশ্ন দাঁড়ায়–তদন্ত কি সত্য উদ্ঘাটনের জন্য হচ্ছে, নাকি তদন্তের মাধ্যমেই একধরনের ভীতির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে?
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কারও নাম আসা আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো শিক্ষককে আগে সামাজিকভাবে 'রাষ্ট্রবিরোধী' চিহ্নিত করে পরে তদন্ত শুরু করা হলে, এবং এর মধ্যেই বেতন বন্ধ, পদোন্নতি স্থগিত বা বিদেশযাত্রায় বাধা তৈরি হলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই একধরনের বাস্তব শাস্তি কার্যকর হয়ে যায়। তখন প্রশ্ন থাকে না, তিনি অপরাধ করেছেন কি না; প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় তদন্ত চলাকালেই তাঁর পেশাগত ও পারিবারিক জীবন কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আব্দুল ওদুদ, অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম ও ড. মোবারক হোসেনের বেতন বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি, লিখিত আদেশ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব থাকা দরকার। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক শবনম জাহানসহ এগারো জন শিক্ষককে বিদেশ যাওয়ার অনাপত্তিপত্র না দেওয়া এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের কক্ষে হেনস্তা ও ভাঙচুরের অভিযোগও উদ্বেগজনক।
শিক্ষা ও গবেষণার সবচেয়ে বড় শত্রু অজ্ঞতা নয়, ভয়। শিক্ষক ক্লাসে কথা বলার আগে যদি ভাবেন এই বক্তব্য পরে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে কি না, তাহলে তিনি আর স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করতে পারেন না। শিক্ষক চুপ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীরাও শেখে—সব প্রশ্ন করা নিরাপদ নয়। এভাবেই তৈরি হয় 'নিরাপদ কথা বলার' সংস্কৃতি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ সত্য অনুসন্ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪০৪ জন শিক্ষকের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ৪০৪টি ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে হাজারো শিক্ষার্থী ও গবেষকের মধ্যে। শিক্ষকের ওপর মানসিক চাপ বাড়লে ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
একজন শিক্ষক কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হতে পারেন, কোনো সরকারের সমর্থক বা সমালোচক হতে পারেন, এমনকি বিতর্কিত মতাদর্শ নিয়ে একাডেমিক গবেষণাও করতে পারেন, এর কোনোটিই নিজে থেকে অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে কেউ সহিংসতায় উসকানি দিলে, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করলে বা আইন দ্বারা নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাজনৈতিক মত ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে গুলিয়ে ফেললে আইনের শাসনই দুর্বল হয়ে পড়ে।
উল্লেখিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নাম আসার কারণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি না করার অভিযোগও উঠেছে, যেখানে যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক প্রভাস কুমার, সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগর, সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন ও অধ্যাপক সালমা খাতুনকে বহিষ্কারের ঘটনাও একই প্রশ্ন তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় ও আন্তর্জাতিক ফেলোশিপের মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্ঞানব্যবস্থার অংশ। বাংলাদেশের শিক্ষকেরা রাজনৈতিক অভিযোগে সহজেই তদন্ত বা প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হন, এমন ধারণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে গবেষণা সহযোগিতায়, এবং তা মেধা পাচারের আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৪ আগস্টের প্রতিবেদনকেন্দ্রিক অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু কোনো শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে অপছন্দনীয় হলেই তাঁকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। প্রতিটি অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি থাকতে হবে, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে, এবং তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মর্যাদা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও রাখা জরুরি।
রাষ্ট্রের শক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরবতায় নিহিত নয়, বরং তার স্বাধীনতাতেই। ৪০৪ জন শিক্ষককে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে তাই কেবল একটি প্রশাসনিক তদন্ত হিসেবে না দেখে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার চরিত্র, আইনের শাসন ও ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এই পরীক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা; প্রশাসনের দায়িত্ব ভয় তৈরি করা নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
মো. আব্দুল আওয়াল: সাবেক উপাচার্য, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ; সাবেক ভিজিটিং অধ্যাপক টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা।
- বিষয় :
- উচ্চশিক্ষা
- শিক্ষাঙ্গন