সিএনএনের বিশ্লেষণ
বিশৃঙ্খলা ত্বরান্বিত করছেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি- সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৩:২৬
বিশ্বে এখন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত ৮০ বছরের যে কোনো সময় হলে যুক্তরাষ্ট্র স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ভূমিকা পালন করত। বিস্ময়করভাবে এখন পশ্চিমাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটি বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্ষিক ভাষণ এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশে তার জনপ্রিয়তা কমছে। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধকে আলোচ্যসূচিতে রেখে জাতিসংঘের বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন ট্রাম্প, যাতে তিনি না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবু ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প তাঁর ভাষণে দাবি করবেন– যুক্তরাষ্ট্র কখনও এত শক্তিশালী বা সম্মানিত ছিল না।
চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, ‘আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আমরা বেশি সম্মানিত। আমি বৈঠকে গেলে সবাই দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের আগের প্রেসিডেন্টের জন্য তারা দাঁড়াত না; তারা তাঁকে গুরুত্ব দিত না।’
কিন্তু বিশ্বের বড় একটি অংশ তাঁর সঙ্গে একমত নয়। কানাডা ও ইউরোপের মতো একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এক হওয়ার চেষ্টা করছে, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না। কারণ, যাকে তারা এতদিন নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখেছে, সেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখন নিজেদের রক্ষা করতে হচ্ছে। ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিশ্বের আস্থাও কমে যাচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেকে ‘মধ্যম শক্তির’ দেশগুলোর এমন এক নেতার ভূমিকায় তুলে ধরছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক যুগের পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত মাসে তিনি বলেন, ‘আমেরিকা বদলে গেছে। ওয়াশিংটন থেকে বয়ে আসা ঝড় আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।’
ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি এখন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্বেরই সম্প্রসারণ হয়ে উঠেছে। বস্তুগত স্বার্থ আদায়ে হুমকি ও শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা এতে স্পষ্ট। গত সপ্তাহে ফক্স নিউজে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার’ কথা ভাবা যায় কিনা, তা নিয়েও মন্তব্য করেন।
২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে ট্রাম্প এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা পশ্চিমাবিশ্বকে ভিত থেকে নাড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি সব সময় আমেরিকাকে সবার আগে রাখব।’ দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি সেই রূপান্তর সম্পূর্ণ করেছেন। ট্রাম্প মিত্রদের আক্রমণ করছেন এবং চীনের নেতা শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো কর্তৃত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন।
নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ভেনেজুয়েলার তেল ১০০ বছরের একটি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের মজুত পূরণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা রয়েছে। ভেনেজুয়েলায় সাফল্যের এই উচ্ছ্বাস ট্রাম্পকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তিনি ভেবেছিলেন একইভাবে ইরানকেও ধ্বংস করতে পারবেন। এখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে আটকে পড়েছেন ট্রাম্প। তাঁর কারণে সৃষ্ট চাপের মধ্যে ইউরোপের পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমন একটি যুদ্ধ; যার কারণে তেল, পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ইউরোপে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে। কারণ ট্রাম্প প্রশাসন সেখানকার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আক্রমণকারী ডানপন্থি জনপ্রিয়তাবাদীদের সমর্থন দিচ্ছে।
আধুনিক ভূ-রাজনীতির আরেকটি নতুন বাস্তবতার শিক্ষাও ট্রাম্প গত বছর পেয়েছেন। চীনের সঙ্গে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত থেমে যায়, যখন বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের রপ্তানি কমিয়ে দেয়। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে হুমকি এমন এক ভাঙন তৈরি করেছে, যাকে ‘জোটব্যবস্থার ভাঙন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন কার্নি।
- বিষয় :
- ট্রাম্প