ইরানের এক-দুটি স্থাপনায় এখনো হামলা চালানো বাকি: ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি
গালফ নিউজ
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ১২:৪৭
ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ ধ্বংস করা হয়েছে দাবি করে দেশটির আরও এক বা দুটি স্থাপনায় হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এসব স্থাপনা ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১০ মিনিট সময় লাগবে। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। অন্যদিকে, নতুন করে হামলা চালানো হলে কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।
শনিবার ফ্লোরিডায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দিয়েছে। তবে এখনো এক বা দুটি স্থাপনা বাকি রয়েছে। সেগুলো ধ্বংস করতে মাত্র ১০ মিনিট সময় লাগবে। সম্ভাব্য ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের বিষয়ে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সেটির বিষয়েও ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব অভিযান খুব দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনা ভালোভাবেই চলছে। তবে দেশটির ওপর খুব একটা ভরসা করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র এখনই কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে তাড়াহুড়ো করছে না।
এর আগে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে নতুন করে হামলা না চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। দুই দেশেই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের পর ইরানে পুনরায় হামলা চালানোর আশঙ্কার মধ্যে শনিবার তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।
এর আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলা হতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ঐতিহাসিক ও অনন্য সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
উভয় দেশের নির্বাচনই চলমান সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। ইসরায়েলে মঙ্গলবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এখনো নতুন সরকার গঠিত হয়নি।
এক বিবৃতিতে জানানো হয়, শনিবার শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে মোজতবা খামেনি বলেছেন, যেকোনো পর্যায়ের বা ধরনের হুমকির জবাব তাৎক্ষণিক ও কার্যকরভাবে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সামরিক কমান্ডারদের নির্দেশ দিয়েছেন, দেশটির লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় আমেরিকান-জায়নিস্ট শত্রুপক্ষের সব ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
খামেনি ও দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে এটিই প্রথম বৈঠকের খবর। গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালীর তলদেশে থাকা ক্যাবল বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে বলে সতর্ক করেছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের শনিবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে মাইন আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। এর আগে শুক্রবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানায়, তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার অনির্দিষ্ট কিছু ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার পর অথবা মাইনের আঘাতে আটকে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে আসন্ন নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে যুদ্ধটি অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাট দল সাফল্য পেলে ট্রাম্পের নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হতে পারে।
ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শিবির পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে পরবর্তী সরকার কেমন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে, সংঘাত নতুন করে শুরু হওয়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে পৌঁছান। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ির কাছে একটি চিঠি পাঠান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান রেজায়ি ইরানি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভিডিওতে বলেন, তিনি চিঠিটি পড়েছেন, তবে এখনো কোনো জবাব দেননি। চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুর পুরোপুরি বদলে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এটিকে ভালো লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, বর্তমানে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের শর্তগুলো স্পষ্ট এবং মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।
রেজায়ি জানিয়েছেন, জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করাসহ ইরানের অন্যান্য শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ রাখা হবে। কাতার ও পাকিস্তান বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, সংঘাত নতুন করে শুরু হলে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধের আগুন নিঃসন্দেহে আরও বৃহত্তর ভৌগোলিক এলাকাকে গ্রাস করবে।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সতর্ক করে বলেছেন, এখন থেকে আর কোনো রেড লাইন বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা থাকবে না।