তালেবান ও পাকিস্তান সরকারের দূরত্ব
আফগানিস্তানে পাকিস্তানি বিমান হামলা, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪
মূল : হামিদ হাকিমি।। অনুবাদ: বিপাশা মন্ডল
প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৫ | ২২:৩৩
তালেবানরা ২০২১ সালের আগস্টে কাবুলের ক্ষমতা দখল করার পরে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রশিদ আহমেদ তোরখাম ক্রসিংয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে একত্র হয়ে একটি বিজয়ী সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। শেখ রশিদ আহমেদ দাবি করেছিলেন, তালেবানদের দ্রুত এই ক্ষমতায় আসা একটি ‘নতুন স্তম্ভ’ সৃষ্টি করবে এবং এই শাসন বিশ্বমানে পৌঁছে যাবে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তালেবানের ক্ষমতা ফিরে পাওয়াকে ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার সমান’ বলে গণ্য করেছিলেন।
প্রায় ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানের তালেবানরা একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই বিদ্রোহ করে আসছিল। একটা সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশি দেশের একটি জোট ওখানে ছিল। সে সময় তালেবান নেতা ও যোদ্ধারা আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে পাকিস্তানের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ তালেবান নেতারাও সেখানে থেকেছিলেন এবং পাকিস্তানের কোয়েটা, পেশোয়ার এবং পরবর্তীকালে করাচির মতো বড় বড় শহরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। পাকিস্তানের ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম হাক্কানিয়াসহ বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচুর তালেবান নেতা এবং অনেক যোদ্ধা পড়াশোনা করেছেন। জানা যায়, তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর দারুল উলুমে পড়াশোনা করেছিলেন। তালেবানরা পাকিস্তানি সমাজের প্রতিটি স্তরজুড়ে একটি আন্তঃক্রিয়া, নির্ভরশীলতা ও মিথস্ক্রিয়ার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছিলেন; যার মাধ্যমে ২০০৩ সালের দিকে শুরু হওয়া একটি প্রাণঘাতী বিদ্রোহ পুনর্গঠিত এবং সফলভাবে শুরু করতে সক্ষম হয়।
পাকিস্তানের সহযোগিতা ও আশ্রয় ছাড়া তালেবানদের সফল অভ্যুত্থান একেবারেই সম্ভব ছিল না।
এই পশ্চাৎপটভূমি পর্যালোচনায় যা অনুমান করা যায়, সাম্প্রতিককালের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি, আফগানিস্তানের ভেতরে পাকিস্তানি মিলিটারির বিমান হামলা কি ইসলামাবাদ ও আফগান তালেবানদের মধ্যে উত্তেজনার সর্বশেষ প্রমাণ?
পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্কের একটি জটিল ইতিহাস রয়েছে। পাকিস্তান যখন কাবুলে তালেবানদের স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল, তখন তালেবান সরকার পাকিস্তানের আশা অনুযায়ী সহযোগিতা প্রদর্শন করেনি। তারা তখন বৃহত্তর আফগান সমাজের সমর্থন জোগাড়ে জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের বক্তব্য ও আচার-আচরণে তাল মিলিয়েছিল। তালেবান নেতারাও তখন একটি যোদ্ধা দল থেকে নিজেদের পরিপূর্ণ সরকারে রূপান্তরের প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে পাকিস্তানের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা সরিয়ে সম্পর্ক স্থাপনের একটি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
ঔপনিবেশিক যুগে নির্ধারিত একটি সীমানারেখা– ডুরান্ড লাইন, যা আফগানিস্তান এবং বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যে অঞ্চল ও সম্প্রদায়গুলোকে আলাদা করেছে; ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কোনো আফগান রাষ্ট্রই এটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ডুরান্ড লাইন আন্তর্জাতিকভাবে দুই দেশের সীমানা হিসেবে পরিচিত এবং পাকিস্তান প্রায় পুরোটাতেই সীমান্ত প্রতিরক্ষা দেয়াল টেনে দিয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানে ডুরান্ড লাইন আবেগের জায়গা হয়ে উঠেছে। কেননা এ সীমানারেখার কারণে পশতুন প্রদেশ বর্ডারের দুই দিকে বিভক্ত হয়ে গেছে।
১৯৯০ সালে তালেবান সরকার ডুরান্ড লাইন অনুমোদন করেনি এবং বর্তমান তালেবান শাসকরাও সেই নীতিই অনুসরণ করে আসছেন। পাকিস্তানের চোখে এটিকে একটি সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং পাকিস্তানের ‘কৌশলগত গভীরতার’ মতবাদের প্রতি এটি যেন আফগানিস্তানের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো বিষয়।
আফগানিস্তানে তালেবানদের সফলতার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ড যেন পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হলো। সেখানে ২০২২ সাল থেকে পাকিস্তানি নিরাপত্তা ও পুলিশ বাহিনীর ওপর জঙ্গি হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে খাইবার পাখতুন এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে। বেশির ভাগ আক্রমণের দায় স্বীকার করেছে টিটিপি বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, তথাকথিত পাকিস্তানি তালেবান। টিটিপি ও আফগান তালেবান বহু বছর ধরেই এক ধরনের উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে, প্রায়ই ওয়াজিরিস্তান এবং অন্যান্য পাকিস্তানি বর্ডারসংলগ্ন জায়গায় তাদের আশ্রয়স্থলগুলো বিনিময় করছে। তাদের কৌশল এবং সম্পদও ভাগাভাগি করছে।
পাকিস্তান আফগান তালেবানদের ২০০১ সালের পর থেকে ‘বন্ধু’ হিসেবে গণ্য করছে, যেখানে আংশিকভাবে আন্তঃসীমান্ত পশতুন জাতীয়তাবাদের অনুভূতি দুর্বল করার জন্য এবং আফগানিস্তানের ভেতরে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তালেবানের ওপর এর প্রভাব লাভের আশা করেছে। ২০১১ সালে মাইকেল মুলান– ওই সময়কার আমেরিকান সামরিক প্রধান বলেছিলেন, আফগান তালেবানদের অন্যতম অঙ্গসংগঠন হাক্কানি নেটওয়ার্ক। এরা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (আইএসআই) ‘খাঁটি ডানহাত’; আইএসআই পাকিস্তানের ক্ষমতাসম্পন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
বিশ্লেষকদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে যেমনটি আশঙ্কা করা হয়েছিল, আফগানিস্তানে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উৎসুক তালেবানদের প্রতি পাকিস্তানি সমর্থন, একটি ‘ফিরিক ভিক্টোরি’র (এপিরাসের রাজা ফিরিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৯-এ রোমানদের হারিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বিপুল সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছিল। সেই থেকে এ ঘটনা ফিরিক ভিক্টোরি নামে পরিচিত) সঙ্গে পাকিস্তানি যোদ্ধা এবং অন্যান্য সহিংস রাষ্ট্র অসমর্থিত বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সাহস বাড়িয়ে দেবে। এতে তারা নিজেদের দুর্বল মনে করবে না, বরং উৎসাহিত হবে।
উত্তেজনার তাৎপর্য এবং প্রভাব
তালেবান পাকিস্তানের সীমানাসংলগ্ন আফগানিস্তানের মধ্যে থাকা টিটিপি নেতাদের বিরুদ্ধে নেওয়া যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ মেনে নেবে, এটি একরকম অসম্ভব ব্যাপার। বিশেষ করে এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে তালেবানের সঙ্গে টিটিপির যে সম্পর্কের স্থিতি এবং ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সের (আইএসকেপি) মতো চরমপন্থি গ্রুপগুলোর যে অবাধ বিচরণ, তার ক্ষেত্রেও ভাঙন আসবে। তালেবান নেতারা সেই একই যুক্তি ফিরিয়ে দিচ্ছেন, যে যুক্তি পাকিস্তান দু’দশক ধরে ব্যবহার করে আসছে– আগেকার আফগান সরকারের সব দাবি নস্যাৎ করে দেওয়া এবং আমেরিকার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ানো তালেবানদের কর্মকাণ্ড পাকিস্তানের সীমানার মধ্যেই চলতে দেওয়ার যুক্তি। ঠিক তখনকার পাকিস্তানের মতোই এখন তালেবান যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে যে, টিটিপি একটি আন্তর্জাতিক পাকিস্তানি ইস্যু এবং অবশ্যই ইসলামাবাদকে সমস্যাটি অভ্যন্তরীণভাবেই সমাধান করতে হবে।
পাকিস্তানি সেনা দায়মুক্তির জন্য সম্ভবত আফগানিস্তানের সীমানার মধ্যে অনবরত বোমা ফেলে যাবে এবং তাতে সামান্য আন্তর্জাতিক নিন্দা পেতে পারে। ওখানে দুর্ভাগ্যবশত একটি আর্ন্তজাতিক প্রাধান্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসরায়েল যেমন নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে সীমানা অতিক্রম করে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তেমনি।
আরও দেখি, পাকিস্তানি সেনা, যারা দেশটির দীর্ঘকালীন নিরাপত্তার দেখভাল করেছে, তারা এখন ভয়ংকর রকম চাপের মধ্যে আছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এবং বেলুচিস্তানে অবস্থিত চীনা বিনিয়োগকৃত অর্থনৈতিক প্রকল্পসহ দেশের অবকাঠামো রক্ষার ক্ষেত্রে তাদের দৃশ্যমান শরীরী সক্রিয়তা দেখানোর জন্য। আফগান অধিকৃত অংশে পাকিস্তানের আক্রমণ আসলে বাহ্যিকভাবে সক্ষম ‘শত্রুর’ ওপর আক্রমণ– পাকিস্তানের জনগণকে এ রকম একটি রাজনৈতিক মেসেজ দেয়। এ ছাড়া এই বিমান হামলা ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ক্ষমতায়নের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে রাষ্ট্রকে আড়ালে রাখে, বিশেষ করে পাকিস্তানের পশতুন প্রদেশের বিষয়গুলো।
এর মধ্যে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সম্পদহীনতা, একটি সুগঠিত সেনাদল এবং যে কোনো অর্থপূর্ণ আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পাকিস্তানের দৃঢ়তার বিরুদ্ধে যেন ঘুরে দাঁড়ানো। ২০২৪ সালের মার্চে আফগানিস্তানের আকাশে কখনও কখনও আমেরিকার ড্রোন দেখা যাওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা করে একজন জ্যেষ্ঠ তালেবান মিলিটারি নেতা বলেছেন, আমেরিকা আফগানিস্তানের আকাশসীমায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
যখন তালেবান নেতারা ‘প্রতিশোধ’ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন, এটি অস্পষ্ট থেকে যায় যে কী করে তারা একটি সামরিকভাবে শক্তিশালী পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে এমন হুমকি দিতে পারেন; এটি আবার তাদেরই বিরুদ্ধে যাচ্ছে, যে দেশটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। পাকিস্তানও তালেবানের বিরুদ্ধে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের প্রভাব উল্লেখ করেছে: আফগানিস্তানের বেশির ভাগ স্থলপথের বাণিজ্য পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে চলে এবং পাকিস্তান আফগানিস্তানের লাখ লাখ শরণার্থীকে দশকের পর দশক ধরে আশ্রয় দিয়েছে।
যা হোক, আফগানিস্তানের ভেতরে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ আফগান ও পাকিস্তানের পশতুন এলাকার জনগণের পাকিস্তানবিরোধী চেতনাকে ইন্ধন দিচ্ছে। আফগানিস্তানের ঘটনাটি সামনে এনে দেখা যায়, বিদ্রোহ আসলে সামাজিক ক্ষোভ, অবক্ষয়, অসন্তোষ এবং যুবকদের মোহভঙ্গের ওপর ভর করে হয়। এ জন্য দায়িত্বশীল নেতাদের সামনে আসা অভিযোগগুলো সমাধান করার সাহস দেখাতে হবে। শক্তির প্রতিক্রিয়ামূলক প্রদর্শন হয়তো খবরের শিরোনাম হয়ে কিছুক্ষণের মনোযোগ টানতে পারে, কিন্তু শান্তি অর্জন করা সাধারণত জ্ঞান ও ধৈর্যের একটি শিল্প বলা যায়। বিদ্রুপাত্মকভাবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান অর্থনীতির আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে মিলনের জন্য একটি ফলপ্রসূ রাস্তা বের করছে, যেটা মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করছে। দুঃখজনকভাবে, একটি প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্বপ্ন দেখার অক্ষমতা এবং দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তামূলক সম্পর্কের অভাব দুই দেশের ৩০ কোটির বেশি মানুষের সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
lসূত্র: আলজাজিরা
lহামিদ হাকিমি : আফগান সাহিত্যিক ও মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- আফগানিস্তানে হামলা
