ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক বুকার ২০২৬ বিজয়ী ইয়াং শুয়াং-জি

অনূদিত সাহিত্য দ্বিতীয় জোড়া চোখ

অনূদিত সাহিত্য দ্বিতীয় জোড়া চোখ
×

ইয়াং শুয়াং-জি [জন্ম: ১৯৮৪]

অনুবাদ তারেক মিনহাজ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি ঘোষিত আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার ২০২৬-এর বিজয়ী হয়েছেন মান্দারিন ভাষার লেখিকা ইয়াং শুয়াং-জি। বুকার প্রতিনিধির নেওয়া লেখিকার সাক্ষাৎকারের উল্লেখযোগ্য অংশ পত্রস্থ হলো। অনুবাদ তারেক মিনহাজ

l‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ উপন্যাস লেখার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইছি। 
llকোরিয়া ও তাইওয়ান দুটি দেশই একসময় জাপানি সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল। কোরিয়ানদের মধ্যে সেই ইতিহাস নিয়ে এক ধরনের তীব্র ক্ষোভ কাজ করে, যেখানে তাইওয়ানের মানুষের অনুভূতিটা বেশ জটিল। তাইওয়ানে একই সঙ্গে এক ধরনের তিক্ততা আবার পুরোনো দিনের প্রতি কিছুটা আকুলতা জড়িয়ে আছে। আমি সমসাময়িক তাইওয়ানি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অতীতের সেই জটিল পরিস্থিতিগুলোকে খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম। বুঝতে চেয়েছিলাম আমাদের পূর্বপুরুষেরা সেসব কীভাবে মোকাবিলা করেছিলেন। একই সঙ্গে আমরা কেমন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারি, তা নিয়ে ভাবতেও উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলাম পাঠকদের।
lঅনুপ্রেরণার কথা জানলাম। এবার জানতে চাই গল্প লেখার গল্প। কীভাবে লেখা হলো এ উপন্যাস? 
ll২০১৭ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে আমি বইটির একটা খসড়া রূপরেখা তৈরি করি, এরপর প্রথম অধ্যায়টি লিখে ফেলি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল কাজ শুরু করেছিলাম ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আর ওই বছরের ২০ আগস্ট প্রথম খসড়া লেখা শেষ হলো। উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু, ভ্রমণ আর খাবারদাবার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমার ব্যক্তিগত জীবন দুইভাবে বদলে গেছে। প্রথমত, আমার জমানো টাকা গেছে কমে আর ওজন গেছে বেড়ে।
lএবারের ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজের মূল ভাবনা হলো ‘গল্প, সীমানার রেখা ছাড়িয়ে’। আপনার কী মনে হয়, অনূদিত সাহিত্য কীভাবে পাঠকদের ভৌগোলিক সীমানার ওপারে দেখতে সাহায্য করে এবং এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
llআমার মতো একজন মানুষ যিনি কেবল একটি ভাষাতেই পড়তে পারেন, অনুবাদ না থাকলে বাইরের পৃথিবীকে দেখার পরিধি তার জন্য অনেক ছোট হয়ে আসত। অনূদিত সাহিত্য আমার কাছে দ্বিতীয় এক জোড়া চোখের মতো। এখানেই শেষ নয়। আমার মতে অনুবাদকেরা হলেন অপরিহার্য পথপ্রদর্শক, যাঁরা অচেনা-অজানা দেশের আঁকাবাঁকা দুর্গম পথে পাঠকের হাত ধরে রাখেন, তাঁকে গন্তব্যে পৌঁছে দেন।
lইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ তার বর্তমান রূপে এবার ১০ বছর পূর্ণ করল। এক দশকে এই পুরস্কার কি অনূদিত সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পেরেছে? যদি পেরে থাকে, কীভাবে পেরেছে বলে আপনি মনে করছেন?
ll১০ বছর ধরে ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ লেখক ও অনুবাদক উভয়কেই সমান স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। সমতার এই জায়গাটিতে জোর দেওয়ার কারণে অনূদিত সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের চেনা ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। আমি মনে করি, এটি পাঠকদের মনে এই উপলব্ধি তৈরি করতে সাহায্য করেছে যে দুজন সৃজনশীল মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়া আর যৌথ প্রয়াস ছাড়া একটি চমৎকার সাহিত্যিক অনুবাদ কখনও সম্ভব হতে পারে না।

lশৈশবের কোন বইটি আপনার প্রথম প্রেম? 
llগল্প লেখার জগতে পা রাখার পেছনে আমার প্রথম অনুপ্রেরণা আকিরা তোরিয়ামার মাঙ্গা ‘ড্রাগন বল’। মাঙ্গাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হয় ১৯৮৪ সালে, সে বছর আমার জন্ম। যখন শেষ হয়, আমার বয়স ১১ বছর। সব মিলিয়ে মোট ৪২টি খণ্ড ছিল। আকিরা তোরিয়ামার এই মাঙ্গা আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে গল্প তৈরি করতে হয়। 
lআর কোন বই লেখক হওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল?
llনির্দিষ্ট কোনো একটা বইয়ের নাম আমি বলতে পারব না। তবে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ানের রোমান্স উপন্যাসগুলোর তুমুল জনপ্রিয়তা আমাকে প্রথম ফিকশন বা কথাসাহিত্য লেখার প্রতি আকৃষ্ট করেছিল এটুকু স্মরণ করতে পারি। তখন আমার মাধ্যমিক স্কুলের কয়েকজন সহপাঠী মিলে আমরা একটি লেখার দল তৈরি করেছিলাম। তবে পাঁচজনের মধ্যে শুধু আমিই শেষ পর্যন্ত লেখালেখিটা ধরে রাখতে পেরেছি।
lএমন কোনো বই আছে, যে বই পৃথিবী সম্পর্কে আপনার ভাবনার জগৎ বদলে দিয়েছে?
ll‘দি অ্যানালেক্টস’-এর নাম বলতে পারি, তবে ভাবনাকে বদলে দেওয়ার প্রক্রিয়াটা একটু অন্যরকম। অ্যানালেক্টস কনফুসিয়াসের দর্শনের মূল ভিত্তি। প্রায় দুই হাজার বছর আগে রচিত। কিশোর বয়সে যখন এটি পড়ি তখন কনফুসিয়াসের চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা চীনা সংস্কৃতির প্রতি আমার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। তাই কলেজে আমি চীনা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করি, কিন্তু বড় হওয়ার পর অবাক হয়ে আবিষ্কার করি ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কুনফুসীয় দর্শনকে শোসক-শাসকেরা কীভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে! তখনই আমি নিজের জন্য নতুন আর স্বাধীন এক চিন্তার ভিত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিই।
lমান্দারিন (চীনা) ভাষায় লেখা কোন বইটি সবার পড়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
llআমি আসলে বিশ্বাস করি না কোনো বই অবশ্যপাঠ্য বা সবার জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে। তবে যারা চীনা অক্ষরের সংস্কৃতিগুলোর চিন্তাভাবনা ও জীবনবোধ বুঝতে চান, তাদের জন্য ‘দি অ্যানালেক্টস’-এর নাম উল্লেখ করতে পারি। একই সঙ্গে বইটি পড়ার সময় যেন একটু সন্দেহবাদী বা যৌক্তিক চোখ খোলা রাখা হয়, সেই অনুরোধও করব।
lইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজের তালিকায় মনোনীত এমন কোন বইটি আপনার মতে সবার পড়া উচিত?
llআগের প্রশ্নের উত্তরের মতোই বলব, কোনো বই-ই সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে উ মিং-ই’র লেখা আর ডেরিল স্টার্কের অনুবাদ করা ‘দ্য স্টোলেন বাইসাইকেল’ উপন্যাসটি আমার দারুণ লেগেছে। বইটি ২০১৮ সালের ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজের লংলিস্টে জায়গা পেয়েছিল। 

আরও পড়ুন

×